ত্রিপুরার ডিজিপি অনুরাগ ধনকরের রহস্যমৃত্যু! আত্মহত্যা নাকি অন্য কিছু? দেশজুড়ে চাঞ্চল্য!

ত্রিপুরার পুলিশ মহাপরিচালক তথা আইপিএস অফিসার অনুরাগ ধনকর সোমবার আকস্মিকভাবে মারা গেছেন। প্রাথমিক তদন্তে এটি আত্মহত্যার ঘটনা বলে অনুমান করা হলেও, মৃত্যুর আসল কারণ এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। এই মর্মান্তিক ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গোটা পুলিশ বিভাগ এবং তাঁর উত্তর প্রদেশের বাগপত জেলার বিহারিপুর গ্রামের পৈতৃক বাড়িতে শোকের গভীর ছায়া নেমে এসেছে। অত্যন্ত মেধাবী ও কৃতি এই পুলিশ অফিসারের হঠাৎ এমন প্রয়াণে দেশজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং বর্তমানে এই মৃত্যুর সঠিক কারণ উদঘাটনে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চলছে।

উত্তর প্রদেশের বাগপত জেলার বিহারিপুর গ্রামের এক অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্ম হয়েছিল অনুরাগ ধনকরের। তাঁর পরিবারের বহু সদস্য দীর্ঘকাল ধরে সুনামের সঙ্গে সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর পিতামহ হীরা সিং ধানকাড় মিরাট জেলে সুপারিনটেনডেন্ট এবং পরিবারের অন্য সদস্য জয় সিং ধানকাড়ও কারা বিভাগে জেলার হিসেবে অত্যন্ত সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এছাড়া অনুরাগ ধনকরের বাবা প্রয়াত সতপাল সিং ধানকাড় পরপর দুবার বিহারীপুর গ্রামের প্রধান নির্বাচিত হয়ে এলাকার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। এই সুশৃঙ্খল ও জনসেবামূলক পারিবারিক পরিমণ্ডলেই তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল, যা তাঁর পরবর্তী প্রশাসনিক জীবনের জন্য একটি অত্যন্ত শক্ত ভিত তৈরি করে দিয়েছিল।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করে অনুরাগ ধানকর তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন একেবারে অন্য একটি পেশা দিয়ে। বারৌতের সিন্ডিকেট ব্যাঙ্কে ফিল্ড অফিসার হিসেবে পেশাজীবন শুরু করার পরেও তাঁর অদম্য জেদ ও উচ্চাশা তাঁকে থামিয়ে রাখেনি। ব্যাঙ্কের চাকরির পাশাপাশি তিনি কঠোর পরিশ্রম করে ইউপিএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি চালিয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৯৪ সালে ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস বা আইপিএস-এ সফলভাবে নির্বাচিত হন। আইপিএস অফিসার হিসেবে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পদে নিজের দক্ষতার ছাপ রেখে গেছেন। তাঁর এই সুদীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই-তে পুলিশ সুপার, ডিআইজি, যুগ্ম পরিচালক এবং অতিরিক্ত পরিচালকের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। বিশেষ করে, দেশের অন্যতম আলোচিত ও কুখ্যাত পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক বা পিএনবি কেলেঙ্কারির মূল অভিযুক্ত পলাতক হিরে ব্যবসায়ী নীরব মোদী মামলার হাই-প্রোফাইল তদন্তের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। এছাড়াও সেন্ট্রাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্স, বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স এবং কসোভোয় রাষ্ট্রপুঞ্জের মিশনে আইজি পার্সোনেলের মতো মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে সামলেছেন তিনি।

প্রশাসনিক দক্ষতা ও কাজের প্রতি চরম নিষ্ঠার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৫ সালের মে মাসে তাঁকে ত্রিপুরার পুলিশ মহাপরিচালক বা ডিজিপি পদে নিযুক্ত করা হয়। এই পদে আসীন হয়ে তিনি ত্রিপুরার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও সুদৃঢ় করতে বেশ কিছু যুগান্তকারী ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পরিবারে দেশসেবার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে; তাঁর বড় দাদা বিবেক ধানকাড় ভারতীয় বিমান বাহিনী থেকে অবসর নিয়েছেন এবং ছোট ভাই রবিরাজ ধানকাড় ব্যবসা করেন। বাগপতের এক সাধারণ বিহারিপুর গ্রাম থেকে উঠে এসে দেশের সর্বোচ্চ পুলিশ পদে পৌঁছানোর এই অবিশ্বাস্য যাত্রাকে বরাবরই কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হতো। তবে তাঁর এই আকস্মিক ও রহস্যজনক মৃত্যু সবাইকে এক গভীর অন্ধকারের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেই এই মর্মান্তিক মৃত্যুর আসল সত্যতা প্রকাশ্যে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।