ত্বিশা শর্মা মৃত্যু মামলায় চাঞ্চল্যকর মোড়! সিবিআইয়ের ৬৩৫ পাতার চার্জশিটে নাম জড়াল অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির

মধ্যপ্রদেশের বহুল আলোচিত এবং চাঞ্চল্যকর ত্বিশা শর্মা মৃত্যু মামলায় তদন্তের প্রাথমিক কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই। সম্প্রতি ভোপাল আদালতে এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা প্রায় ৬৩৫ পৃষ্ঠার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তারিত অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দাখিল করেছেন। সিবিআইয়ের এই চার্জশিটে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে নাম উঠে এসেছে অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ গিরিবালা সিং এবং তাঁর ছেলে সমর্থ সিংয়ের। মূলত আত্মহত্যায় প্ররোচনা জোগানো, অকথ্য মানসিক হয়রানি করা এবং যৌথ অপরাধমূলক অভিপ্রায়ের নির্দিষ্ট ধারায় উভয় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। তদন্ত প্রক্রিয়াকে আরও বেশি মজবুত এবং অকাট্য করে তুলতে সিবিআইয়ের পক্ষ থেকে মোট নব্বই জন ব্যক্তিকে সরকারি সাক্ষী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মৃত ত্বিশা এবং অভিযুক্তদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের ডিজিটাল ইমেজিং এবং ইলেকট্রনিক ডেটা বিশ্লেষণ করে ভয়ানক মানসিক নির্যাতন ও নিপীড়নের বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হাতে এসেছে। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, এই মামলায় ভোপাল এইমস এবং দিল্লির সর্বভারতীয় আয়ুর্বিজ্ঞান সংস্থান বা দিল্লি এইমসের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য সামনে আসায় পুরো তদন্ত প্রক্রিয়ায় একটি সম্পূর্ণ নতুন মোড় এসেছে। বর্তমানে আইফোন থেকে সংগৃহীত ডেটা, সিসিটিভি ফুটেজের ডিভিআর এবং ভয়েস স্যাম্পলের ওপর সেন্ট্রাল ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি বা সিএফএসএল-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে সিবিআই। এর পাশাপাশি যৌতুকজনিত মৃত্যু এবং যৌতুক দাবির গুরুতর অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে তদন্তের কাজও সমান্তরালভাবে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

সিবিআইয়ের এই সুদূরপ্রসারী তদন্তে অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজের বড় ছেলের প্রাক্তন স্ত্রী দিব্যা সিং সম্পর্কিত বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্যও প্রকাশ্যে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে যে, বিয়ের পর সন্তান ধারণে অক্ষমতা এবং কর্মসংস্থান বা চাকরির মতো বিষয়গুলিকে কেন্দ্র করে তাকে চরম মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল। পরবর্তীতে তাদের সেই সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে যায়। এমনকি তদন্তের সময় সমর্থ সিংয়ের একটি কথিত বক্তব্যও উঠে এসেছে, যেখানে তিনি তার প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে করা দুর্ব্যবহার এবং অন্যায়ের বিষয়ে নিজের মায়ের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন। তদন্তের ফাইল ঘেঁটে জানা গেছে যে, মৃত ত্বিশা গত বছরের এপ্রিল মাসে গর্ভবতী হয়েছিলেন। কিন্তু স্বামীর অত্যন্ত রূঢ় আচরণ এবং ক্রমাগত মানসিক চাপের কারণে তিনি গর্ভপাত করানোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। চিকিৎসকদের সঠিক পরামর্শ অনুযায়ী তিনি মে মাসের শুরুর দিকে গর্ভপাতের ওষুধ সেবন করেন।

অভিযোগ রয়েছে যে, ওষুধ খাওয়ার পরেও তিনি তার স্বামী ও শাশুড়ির পক্ষ থেকে অবিরাম কটূক্তি ও মানসিক চাপের শিকার হয়ে চলেছিলেন। যদিও সিবিআইয়ের বর্তমান চার্জশিটে সরাসরি যৌতুক হত্যা কিংবা যৌতুক চাওয়ার মতো অভিযোগগুলি এখনই অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, তবে এই সমস্ত গুরুতর দিকগুলির তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অব্যাহত রয়েছে। মামলার গভীরে লুকিয়ে থাকা সমস্ত ডিজিটাল প্রমাণ নিখুঁতভাবে উদ্ধারের উদ্দেশ্যে মৃত ত্বিশার ব্যবহৃত আইফোনটি ইতিমধ্যেই দিল্লির সিএফএসএল-এ পাঠানো হয়েছে। এর থেকে এই জটিল মামলা সম্পর্কিত আরও অনেক নতুন এবং চাঞ্চল্যকর ডিজিটাল প্রমাণ বেরিয়ে আসার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

তদন্তে আরও প্রকাশ পেয়েছে যে, ত্বিশা শর্মা মামলায় দুটি সম্পূর্ণ আলাদা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। যদিও দুটি প্রতিবেদনেই মৃত্যুর প্রাথমিক কারণ হিসেবে গলায় ফাঁস লেগে শ্বাসরোধ হওয়ার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তবুও মৃতদেহের শরীরে থাকা আঘাতের চিহ্ন সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণে বিস্তর ফারাক রয়েছে। ভোপাল এইমসে সম্পন্ন হওয়া প্রথম ময়নাতদন্তের রিপোর্টে মৃত্যুর পূর্বে তরুণীর শরীরে একাধিক আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল। অথচ মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশে যখন দিল্লি এইমসে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত করা হয়, তখন শরীরে কোনো ধরনের আঘাতের চিহ্নই পাওয়া যায়নি। এই দুই ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অমিল তদন্তকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।

ডিজিটাল প্রমাণের ক্ষেত্রে ত্বিশা এবং অভিযুক্তদের ফোন থেকে উদ্ধার হওয়া অডিও রেকর্ডিং খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সিসিটিভি ক্যামেরার রেকর্ডিং ধারণকারী ডিভিআরটিতে কোনো রকম কারসাজি বা এডিটিং করা হয়েছে কি না, তা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হবে। এছাড়াও অভিযুক্ত দুই ব্যক্তির কণ্ঠস্বরের নমুনা সংগ্রহ করে তা সিএফএসএল-এ পাঠানো হয়েছে, যা অন্যান্য অডিও ফাইলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। সব মিলিয়ে সিবিআই বর্তমানে আত্মহত্যায় প্ররোচনা এবং মানসিক নির্যাতনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে এই চার্জশিট পেশ করলেও, মামলার নেপথ্যে থাকা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির তদন্ত সমানতালে চালিয়ে যাচ্ছে।