টিস-এর সমাবর্তনে ব্রাত্য প্রধান বিচারপতি! ছাত্রবিক্ষোভের আশঙ্কায় শেষ মুহূর্তে বাদ পড়ল নাম

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর ঘিরে শুরু হওয়া বিতর্কের রেশ কাটছে না। এই চলমান প্রতিবাদের জেরে মহারাষ্ট্রের অত্যন্ত নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘টাটা ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল সায়েন্স’ বা ‘টিস’-এর সমাবর্তনের মূল অতিথি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে প্রধান বিচারপতির নাম। প্রথমে গত ২ অগস্ট এই সমাবর্তন হওয়ার কথা থাকলেও অনুষ্ঠান শুরুর মাত্র দু’দিন আগে অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে তা স্থগিত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে আগামী ২২ অগস্ট নতুন তারিখ ধার্য করা হলেও নবপ্রকাশিত নিমন্ত্রণপত্রে দেখা যায় যে প্রধান বিচারপতির নাম বাদ দিয়ে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালের ডিরেক্টর সি এস প্রমেশকে। প্রাতিষ্ঠানিক সূত্রে জানা গিয়েছে, সম্ভাব্য ছাত্রবিক্ষোভের আশঙ্কা এবং প্রধান বিচারপতির কঠোর নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই কর্তৃপক্ষ এই বড় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন।
এই পুরো প্রতিবাদের সূত্রপাত হয়েছিল মূলত হায়দরাবাদের ‘ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ লিগ্যাল স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ’ বা ‘নালসার’-এ। গত ২৩ জুলাই উপাচার্য, শিক্ষক ও রেজিস্ট্রারকে ইমেল পাঠিয়ে প্রধান বিচারপতিকে সমাবর্তনে আমন্ত্রণ জানানোর তীব্র বিরোধিতা করেন শিক্ষার্থীদের একাংশ। এর পরেই সুর চড়ায় দেশের বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া বা বিসিআই। বিসিআই-এর সর্বভারতীয় প্রধান মননকুমার মিশ্র নালসারের উপাচার্যের কাছে প্রতিবাদী পড়ুয়াদের নামের তালিকা তলব করেন এবং কড়া ফরমান জারি করে জানান যে ২০২৬ সালের নালসার থেকে উত্তীর্ণ কোনো ছাত্র পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত রাজ্য বার কাউন্সিলগুলোতে আইনজীবী হিসেবে নথিভুক্ত হতে পারবেন না। বার কাউন্সিলের এই একতরফা ও কঠোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হলে অসন্তোষ প্রকাশ করেন স্বয়ং প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। বার কাউন্সিলের অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে বিষয়টি তাঁর এবং ছাত্রদের একান্ত মধ্যবর্তী ব্যাপার এবং পড়ুয়াদের নিজস্ব মতপ্রকাশের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। প্রধান বিচারপতির এই কড়া মনোভাব প্রকাশের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সুর বদলে নালসারের আইন শিক্ষার্থীদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চান বিসিআই চেয়ারম্যান মননকুমার মিশ্র এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের ঘোষণা করেন।
যদিও বার কাউন্সিল পিছু হঠলেও শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ কমেনি। সম্প্রতি বেঙ্গালুরুর ‘ন্যাশনাল ল স্কুল অফ ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটি’ বা এনএলএসআইইউ-এর সমাবর্তনেও প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিসিআই চেয়ারম্যান তথা বিজেপি সাংসদ মননকুমার মিশ্রের উপস্থিতি বাতিল করার দাবিতে জোরালোভাবে সরব হয়েছেন বর্তমান ও প্রাক্তন পড়ুয়ারা। শিক্ষার্থীদের এই প্রবল ক্ষোভের নেপথ্যে রয়েছে প্রধান বিচারপতির সাম্প্রতিক কিছু বিতর্কিত মন্তব্য ও পদক্ষেপ। প্রথমত, দেশের যুব সমাজকে ‘আরশোলা’র সঙ্গে তুলনা করার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে, যদিও পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতি সাফাই দিয়ে জানান যে তিনি যুবসমাজকে নয়, বরং বিচারব্যবস্থার ক্ষতিকারক ভুয়ো ডিগ্রিধারী আইনজীবীদের উদ্দেশ্যেই ওই শব্দ প্রয়োগ করেছিলেন এবং তাঁর বক্তব্য বিকৃত করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, গত ২০ জুলাই ককরোচ জনতা পার্টির সংসদ ভবন অভিযানে পুলিশের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের হলে, শুনানিতে আবেদনকারী আইনজীবী ভিডিও প্রদর্শন করতে চাইলে প্রধান বিচারপতি তা খারিজ করে বলেন যে তাঁদের ভিডিও দেখার সময় নেই। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রধানের এই অবস্থানকেও প্রতিবাদের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন আন্দোলনকারী পড়ুয়ারা।