তেলের বাজারে বড় স্বস্তি! আমেরিকা-ইরান সংঘাতে বিরতির প্রভাবেই কি হুড়মুড়িয়ে কমল দাম?

আমেরিকা ও ইরানের সামরিক সংঘাতে সাময়িক বিরতি ঘোষণা হওয়ার পর বিশ্ববাজারে তেলের দামে তার স্পষ্ট ও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সোমবার বিশ্ববাজারে বেশ খানিকটা কমেছে অপরিশোধিত তেলের দাম। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ চিরস্থায়ী হওয়া এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী আবারও পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়টি এখন একটি অত্যন্ত ইতিবাচক অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে।

টানা ১৩ দিন ধরে ইরানের বিভিন্ন তৈল শোধনাগারে একটানা তীব্র হামলা চালানোর পর আপাতত সেই সামরিক পথ পরিহার করেছে আমেরিকা। রাষ্ট্রসঙ্ঘে নিযুক্ত আমেরিকার প্রতিনিধি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, দেশের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চান মধ্যপ্রাচ্যে আলোচনার সুস্থ আবহ বজায় থাকুক। সেই উদ্দেশ্যেই মার্কিন বাহিনী আপাতত কোনো নতুন হামলা চালাচ্ছে না। আমেরিকার এই ইতিবাচক পদক্ষেপের জবাবে তেহরান থেকেও জানানো হয়েছে যে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত আমেরিকার কোনো মিত্র দেশে আর হামলা চালাবে না। দুই তরফের এই যুগান্তকারী ঘোষণা উপসাগরীয় অঞ্চলের জাহাজ চলাচল ও সামগ্রিক তেল শিল্পের জন্য এক বিরাট স্বস্তি বয়ে এনেছে।

এর আগে সম্প্রতি হরমুজ প্রণালীতে ওমানের জলসীমা দিয়ে যাওয়া একটি জাহাজে সরাসরি হামলা চালায় ইরান। ওই ঘটনার পরেই দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাতের মাত্রা চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছিল যে, এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে যেতে পারে কি না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তীব্র চর্চা শুরু হয়েছিল। সংঘাতের তীব্রতা যত বৃদ্ধি পেয়েছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও তত হু-হু করে বাড়তে শুরু করেছিল। গত সপ্তাহে গত মে মাসের পর এই প্রথমবার ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের গণ্ডি পার করে ফেলেছিল। তবে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল কোনো বাধা ছাড়াই অব্যাহত থাকায় গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা খানিকটা হলেও স্বস্তির মুনাফার মুখ দেখতে পেয়েছিলেন।

নতুন করে হামলা না চালানোর বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত এবং হরমুজ প্রণালীর ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমানের সরকারের সঙ্গে চলা আলোচনার সাম্প্রতিক অগ্রগতি—এই সমস্ত নানা ঘটনার আবহে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে অবশেষে স্বস্তি ফিরে এসেছে। ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুটি রাষ্ট্র যাতে একে অপরের প্রতি পারস্পরিক সম্মানজনক অবস্থান বজায় রাখতে পারে, সেই বিষয়েও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।

পরিস্থিতির এই নতুন ও ইতিবাচক মোড় বিশ্ব অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি পুনরায় বেড়ে যাওয়ার তীব্র আশঙ্কা এবং সুদের হার নতুন করে বৃদ্ধির সম্ভাবনা অনেকাংশেই কমিয়ে দিয়েছে। যার ফলে বিশ্বের অধিকাংশ শেয়ার বাজারই ঊর্ধ্বমুখী ধারায় লেনদেন শুরু করেছে। তবে এর মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের এই অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধির দীর্ঘস্থায়ী স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি এই খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের যৌক্তিকতা কতটা, তা নিয়েও বড় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষ করে শেয়ার বিক্রির তীব্র চাপের মুখে বিশ্বের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোই বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এশিয়ার বাজারগুলির মধ্যে সিওল আবারও দরপতনের একদম শীর্ষে অবস্থান করছিল—সেখানে শেয়ার বাজারের প্রধান সূচক এক শতাংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে।

একইভাবে তাইপেই ও সিঙ্গাপুরের শেয়ারবাজারেও বড় ধরনের দরপতন পরিলক্ষিত হয়েছে। এর বাইরে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে ইন্দোনেশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের প্রধান পেরি ওয়ারজিওর আকস্মিক পদত্যাগের জেরে জাকার্তার শেয়ার বাজারেও বেশ নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছে। অন্যদিকে, এর উলটো ছবি দেখা গিয়েছে টোকিওতে। টোকিওতে প্রধান সূচক বৃদ্ধি পেলেও অ্যাডভানটেস্ট, কিওক্সিয়া এবং টোকিও ইলেকট্রনের মতো শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বড় ধরনের বিক্রির চাপের মুখে পড়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে।

তবে সামগ্রিক চিত্রে হংকং, সিডনি, সাংহাই, ওয়েলিংটন এবং ম্যানিলার শেয়ারবাজারে স্পষ্ট উত্থান দেখা গিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ট্রেডাররা এই সপ্তাহে এসকে হাইনিক্স, স্যামসাং এবং জাপানের কিওক্সিয়ার ত্রৈমাসিক আয়ের প্রতিবেদন প্রকাশের অপেক্ষায় মুখিয়ে রয়েছেন। পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানি যেমন মাইক্রোসফট, মেটা, অ্যাপল এবং অ্যামাজনের আয়ের প্রতিবেদনও খুব শীঘ্রই প্রকাশিত হতে চলেছে। এই কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ও বিপুল ব্যয়ের সিদ্ধান্তের দিকেই সমস্ত বিনিয়োগকারীর তীক্ষ্ণ নজর থাকবে।

প্রখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠান কেসিএম ট্রেড-এর বিশিষ্ট বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার এই প্রসঙ্গে মতামত প্রকাশ করে বলেছেন যে, “বিনিয়োগ থেকে প্রকৃত মুনাফা আসতে ঠিক কত দীর্ঘ সময় লাগতে পারে—তা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগের কারণে বিপুল পরিমাণ মূলধনী ব্যয়ের বিষয়টি ট্রেডারদের মনে কিছুটা অস্থিরতা তৈরি করছে।”

চলতি সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের সর্বশেষ নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্তের দিকেও গোটা বিশ্বের আর্থিক বাজারের বিশেষ নজর রয়েছে। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মুদ্রাস্ফীতি ক্রমশ কমে আসার ইঙ্গিতবাহী বিভিন্ন তথ্যের প্রেক্ষাপটে এই নীতিগত সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। গত এক সপ্তাহে সুদের হার আকস্মিক বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে নানা জল্পনা মাথাচাড়া দিলেও অভিজ্ঞ বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, বুধবারের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা বর্তমান সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত করবেন।