ধর্মেন্দ্রকে না খেয়ে মরতে দেননি ‘ভারত কুমার’! মুম্বাইয়ের সেই দিনগুলো কেন আজও বলিউডের সেরা রূপকথা?

বলিউডের রূপকথার দুনিয়ায় তারকাদের সাফল্যের পিছনের গল্প অনেকেরই জানা। কিন্তু পর্দার পেছনের আসল লড়াইয়ের ইতিহাস কজনই বা রাখেন? কিংবদন্তি অভিনেতা মনোজ কুমার যখন মর্যাদাপূর্ণ দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত হন, তখন তাঁর সাফল্যে সবচেয়ে বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন আরেক প্রবাদপ্রতিম তারকা ধর্মেন্দ্র। এই দুই আইকনের বন্ধুত্ব কেবল ইন্ডাস্ট্রির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল চরম সংকটের দিনে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর এক অনন্য দৃষ্টান্ত। খুব কম মানুষই হয়তো জানেন যে, বলিউডে নিজেদের পায়ের তলার মাটি শক্ত করার সেই প্রাথমিক দিনগুলোতে ধর্মেন্দ্র এবং মনোজ কুমার একই ছাদের নিচে বসবাস করতেন।
সেসময় তাঁদের জীবন সংগ্রামের গল্পগুলো ছিল অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। দিল্লি থেকে আসা মনোজ কুমার এবং লুধিয়ানা থেকে মুম্বাইয়ে পা রাখা ধর্মেন্দ্র—উভয়ের শিকড়ই ছিল পাঞ্জাবের মাটিতে। পাঞ্জাবি সংস্কৃতির আত্মিক টান এবং সমবয়সী না হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের মানসিক মিল এই দুই মহাতারকাকে এক সুতোয় বেঁধেছিল। মনোজ কুমারের জন্ম ১৯২৫ সালে এবং ধর্মেন্দ্রের জন্ম ১৯৩৫ সালে হলেও, তাঁদের চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশের ব্যবধান ছিল মাত্র কয়েক বছরের। ১৯৫৭ সালে ‘ফ্যাশন’ ছবির মাধ্যমে মনোজ কুমারের পথচলা শুরু হয় এবং ১৯৬০ সালে ‘দিল ভি তেরা হাম ভি তেরে’ ছবির মাধ্যমে রূপালী পর্দায় পা রাখেন ধর্মেন্দ্র।
তবে বলিউডে টিকে থাকার লড়াইটা তাঁদের জন্য সহজ ছিল না। দিনের পর দিন অডিশন আর স্ক্রিন টেস্টে প্রত্যাখ্যাত হয়ে যখন ধর্মেন্দ্র চূড়ান্ত হতাশায় ভেঙে পড়েন, তখন তিনি ব্যাগ গুছিয়ে পাঞ্জাবের পৈতৃক ভিটেয় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত প্রায় নিয়ে ফেলেছিলেন। ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে ত্রাতা হয়ে আবির্ভূত হন মনোজ কুমার। তিনি শুধু ধর্মেন্দ্রকে বোঝানইনি, বরং তাঁর হাতে হাত রেখে বলেছিলেন, “আমরা একসঙ্গে দুটি রুটি উপার্জন করব এবং তা ভাগ করে খাব।” মনোজ কুমারের এই ঐতিহাসিক উক্তি এবং অকৃত্রিম ভালোবাসাই ধর্মেন্দ্রকে মুম্বাইয়ে থেকে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছিল।
তাঁদের বন্ধুত্বের গভীরতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তাঁরা শুধু একই ঘরেই থাকতেন না, একে অপরের জামাকাপড়ও পরে স্ক্রিন টেস্টে অংশ নিতেন। দুজনের উচ্চতা ও শারীরিক গঠন প্রায় এক হওয়ায় একই শার্ট পালা করে পরতেন তাঁরা। আরেক প্রবীণ অভিনেতা জিতেন্দ্র পরবর্তী সময়ে এই বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করে জানান যে, মনোজ কুমার প্রথম থেকেই ধর্মেন্দ্রের ভেতরে থাকা অসাধারণ প্রতিভাকে চিনতে পেরেছিলেন। তাই ধর্মেন্দ্র যখনই হতাশ হয়ে হাল ছাড়তে বসতেন, মনোজ কুমার তাঁকে নিজের ভাই ও বন্ধুর মতো আগলে রাখতেন। এমনকি অমিতাভ বচ্চন বা বিনোদ খান্নার মতো নবাগতদের কেরিয়ার গড়তেও মনোজ কুমারের অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
পর্দার আড়ালে তাঁদের এই গভীর ভাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক থাকলেও, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে দীর্ঘ কেরিয়ারে তাঁরা খুব বেশি বড় পর্দায় একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাননি। ১৯৯৫ সালের ‘ময়দান-এ-জং’ ছবির একটি বিশেষ গানেই তাঁদের একসঙ্গে ক্যামেরার সামনে দেখা গিয়েছিল, যা ছিল অভিনেতা হিসেবে মনোজ কুমারের শেষ ছবি। আজ দুজনেই ভারতীয় সিনেমার এক একটি জীবন্ত অধ্যায়। প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে গড়ে ওঠা মনোজ কুমার ও ধর্মেন্দ্রের এই সোনালী বন্ধুত্বের ইতিহাস বলিউডের পাতায় চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।