এক লক্ষ টাকার ধার শোধ এড়াতেই বৃদ্ধ ব্যবসায়ীকে নৃশংস খুন! উত্তরপ্রদেশের গোরখপুরে ছাত্রের চতুর ষড়যন্ত্র ফাঁস

উত্তর প্রদেশের গোরখপুর জেলায় এক ভয়াবহ, মর্মান্তিক ও সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সমগ্র এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। মাত্র ১৯ বছর বয়সী এক কলেজছাত্রের অত্যন্ত চতুর ও ঠান্ডা মাথার ষড়যন্ত্রের জেরে খুন হতে হয়েছে এক ৭০ বছর বয়সী প্রবীণ ব্যবসায়ীকে। বেলিপার থানা এলাকার অন্তর্গত কাটিহার বাঁধের সংলগ্ন এলাকা থেকে পুলিশ এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত ছাত্র এবং তার দুই নাবালক সহযোগীকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে। প্রাথমিক তদন্তের পর পুলিশের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, মাত্র এক লক্ষ টাকার একটি সাধারণ ঋণ বা দেনা মেটানোর কাপুরুষোচিত উদ্দেশ্য নিয়েই এই ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত করা হয়েছিল।
পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এসপি সাউথ দীনেশ পুরি একটি সাংবাদিক সম্মেলনে এই লোমহর্ষক মামলার সম্পূর্ণ রহস্য উন্মোচন করেছেন এবং ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছেন। নিহত প্রবীণ ব্যক্তির নাম রামলাল ভার্মা, যাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৭০ বছর। তিনি বাঁশগাঁও থানা এলাকার ধাস্কা ভাটাস গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন এবং কাটরা মালবে বাজারে তাঁর নিজস্ব একটি সোনার গহনার দোকান ছিল। অন্যদিকে, এই ঘটনার মূল অভিযুক্ত ১৯ বছর বয়সী প্রিন্স পান্ডে একটি নতুন বাইক কেনার শখ মেটানোর জন্য রামলাল ভার্মার কাছ থেকে সুদে ১ লক্ষ টাকা ধার নিয়েছিল। যেহেতু মৃত বৃদ্ধের সঙ্গে তার পূর্বপরিচিতি ও সুসম্পর্ক ছিল, তাই প্রিন্স প্রায়ই নিজের বাইকে করে তাঁকে দোকানে আনা-নেওয়া করত কিংবা বাড়িতে পৌঁছে দিত। ঘটনার দিন অর্থাৎ গত বুধবার সকালে রামলাল ভার্মা যখন নিজের দোকানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে একটি টেম্পোর জন্য অপেক্ষা করছিলেন, ঠিক সেই সময়ই প্রিন্স তার এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে বাইকে চড়ে সেখানে এসে উপস্থিত হয় এবং ভালোমানুষির ভান করে তাঁকে দোকানে পৌঁছে দেওয়ার নাম করে নিজের বাইকে তুলে নেয়।
অভিযুক্ত প্রিন্স ওই বৃদ্ধ ব্যবসায়ীকে দোকানে না নিয়ে গিয়ে একটি সুদূর পরিকল্পনা অনুযায়ী দেবদর্শনের লোভ দেখিয়ে এবং মিথ্যে অজুহাত দিয়ে কাটিহার বাঁধের বিখ্যাত কানহাইয়া মন্দিরের দিকে নিয়ে যায়। পুলিশ তদন্তে জানতে পেরেছে যে, মন্দিরের আশেপাশে কিংবা পূর্বনির্ধারিত নির্জন স্থানে প্রিন্সের অন্য সহযোগীরা আগে থেকেই ওত পেতে উপস্থিত ছিল। এরপর সুযোগ বুঝে প্রিন্স ও তার অপ্রাপ্তবয়স্ক সহযোগীরা মিলে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় রামলাল ভার্মাকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে নির্মমভাবে হত্যা করে। অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁরা অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে নিহত ব্যবসায়ীর ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহটি নিকটবর্তী নদীতে ফেলে দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে চম্পট দেয়। গত বুধবার বিকেল প্রায় ৫টার দিকে স্থানীয় গ্রামবাসীরা নদীতে একটি মৃতদেহ ভাসতে দেখতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় পুলিশ থানায় খবর পাঠান। খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ প্রশাসন এবং বিশেষজ্ঞ ফরেনসিক দল দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায় এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে নিহতের চপ্পল ও একটি মদের বোতল উদ্ধার করে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সংগ্রহ করে।
এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের কিনারা করতে মাঠে নামে পুলিশ দল। ঘটনার পর স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন চরম তৎপরতা দেখিয়ে দ্রুত তদন্তের জাল বিস্তার করে। পরবর্তীতে নিহতের ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনে সওয়াল করা হয় যে, ধারালো অস্ত্রের লাগাতার ছুরিকাঘাতের ফলেই ওই বৃদ্ধের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই রিপোর্টের ভিত্তিতে পুলিশ অপরাধস্থলের আশেপাশের রাস্তা এবং বিভিন্ন সংযোগকারী পয়েন্টে ইনস্টল করা সমস্ত সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখতে শুরু করে। আর সেই আধুনিক প্রযুক্তির সিসিটিভি ফুটেজকেই হাতিয়ার করে পুলিশ বৃহস্পতিবার গভীর রাতে প্রধান অভিযুক্ত ছাত্র প্রিন্স পান্ডে এবং নবম শ্রেণীতে পাঠরত এক ছাত্রসহ মোট তিনজনকে জালে ফেলে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের তরফ থেকে সংবাদমাধ্যমকে আরও জানানো হয়েছে যে, এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকা প্রিন্সের এক চাচাতো ভাই এই মুহূর্তে পলাতক রয়েছে এবং তাকে ধরার জন্য পুলিশি তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে।