তারাতলা বিপর্যয়ের দায় কার? তৃণমূলের অন্দরেই উঠল দুর্নীতির অভিযোগের ঝড়

তারাতলা বিপর্যয় ফের একবার কলকাতার বেআইনি নির্মাণ ও পুরসভার ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গার্ডেনরিচ বা নাজিরাবাদের মতো মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রুখতে এবার নড়েচড়ে বসেছে নবান্ন। ‘ঘণ্টাখানেক সঙ্গে সুমন’ অনুষ্ঠানে তৃণমূলের মুখপাত্র প্রদীপ্ত মুখোপাধ্যায় স্পষ্টভাবেই স্বীকার করে নিয়েছেন যে, এই ধরণের বিপর্যয়ের দায় বর্তমান সরকারকে অবশ্যই নিতে হবে। কারণ, দীর্ঘ দেড় দশক ধরে রাজ্য সরকার ও কলকাতা পুরসভা তৃণমূলের দখলেই ছিল।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কড়া পদক্ষেপ ঘোষণা করেছেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, কলকাতা পুরসভা এলাকায় তৃণমূল আমলে অনুমতিপ্রাপ্ত যে সমস্ত বাণিজ্যিক নির্মাণ কাজ বর্তমানে চলছে, তা আগামী ৩১শে জুলাই পর্যন্ত সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে। এই সময়ের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের অডিট কমিটি গঠন করা হবে। কলকাতা পুরসভা, পুলিশ, পূর্ত দফতর, সিভিল ডিফেন্স, দমকল এবং কেএমডিএ (KMDA)-র বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত এই কমিটি প্রতিটি বাণিজ্যিক নির্মাণের বিল্ডিং-প্ল্যান এবং যাবতীয় নথি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখবে। শুধুমাত্র নথি যাচাইয়ের পরেই পরবর্তী ছাড়পত্র দেওয়া হবে।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে দুর্নীতির সুর স্পষ্ট। তিনি সরাসরি ইঙ্গিত করেছেন, টাকার বিনিময়ে আপস করে বা নিয়মের তোয়াক্কা না করে যেখানে প্ল্যান অনুমোদন করা হয়েছে, বিপর্যয় সেখানেই ঘটছে। অর্থাৎ, নির্মাণের আড়ালে যে দুর্নীতির বিষবৃক্ষ দানা বেঁধেছে, তা মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে কার্যত স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। যদিও তৃণমূল নবান্ন থেকে বিদায় নিয়েছে এবং তাদের দলীয় কাঠামোও আজ বিপর্যস্ত, তবুও এই বিতর্ক যেন দলটির পিছু ছাড়ছে না।
শহরের ভৌগোলিক পরিস্থিতি আজ আশঙ্কাজনক। কলকাতার পশ্চিমে বন্দর এলাকা থেকে শুরু করে পূর্বে ট্যাংরা, তপসিয়া বা তিলজলা কিংবা মধ্য কলকাতার বড়বাজার-জোড়াসাঁকো—শহরের সর্বত্রই আজ প্রশ্ন উঠছে যে, বৈধ নির্মাণ বলতে আদৌ কিছু আছে কি না? নির্মাণ মাফিয়া ও অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে গড়ে ওঠা বহুতলগুলো এখন সাধারণ মানুষের গলার কাঁটা।
তারাতলার এই বিপর্যয়ের দিনেই আশি নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর আনোয়ার খানকে মানুষের চরম ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে এবং তাঁকে এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হতে হয়েছে। এটি কেবল একটি ঘটনার চিত্র নয়, বরং সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ। দেড় দশকের শাসনকালে পুরসভার পরিকাঠামো কতটা ভঙ্গুর হয়েছে, তার দায় এড়ানোর উপায় নেই। ৩১শে জুলাই পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ কি কেবল সময়ক্ষেপণ, নাকি সত্যিই কলকাতায় নির্মাণ দুনিয়ায় স্বচ্ছতা ফিরবে, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।