বিজ্ঞানের যুগেও রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে রয়েছে কুসংস্কারের বিষ। আর সেই অন্ধবিশ্বাসের বলি হতে চললেন উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ থানার কানাইপুর এলাকার এক বৃদ্ধা। ডাইনি অপবাদ দিয়ে ৬৪ বছর বয়সী এক বিধবা মহিলাকে বিবস্ত্র করে পৈশাচিক অত্যাচার চালানোর অভিযোগ উঠল গ্রামেরই একাংশের বিরুদ্ধে। বর্তমানে রায়গঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন ওই বৃদ্ধা।
ওঝার নিদান ও পৈশাচিক উল্লাস
ঘটনার সূত্রপাত গ্রামের কিছু শিশুর অসুস্থতা ও এক যুবকের অকাল মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। আধুনিক চিকিৎসার বদলে গ্রামের মাতব্বরেরা শরণাপন্ন হন হেমতাবাদের এক ওঝার। অভিযোগ, সেই ওঝাই নিদান দেয় যে গ্রামের এক বিধবা মহিলাই আসলে ‘ডাইনি’। শুধু তাই নয়, নিদান দেওয়া হয় ওই বৃদ্ধাকে তিন দিন ধরে মল-মূত্র খাওয়াতে হবে, আর তাতে কাজ না হলে তাঁকে মেরে ফেলতে হবে।
নিশুতি রাতে পাশবিক অত্যাচার
বৃহস্পতিবার রাতে আনন্দী বর্মন নামে ওই বৃদ্ধার ওপর চড়াও হয় উন্মত্ত জনতা। অভিযোগ, তাঁকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে প্রতিবেশী লক্ষ্মী বর্মনের বাড়িতে আটকে রাখা হয়। এরপর বৃদ্ধাকে বিবস্ত্র করে, হাত-পা বেঁধে পিলারের সঙ্গে ঝুলিয়ে দফায় দফায় চলে অমানবিক মারধর। পাশবিকতার সীমা ছাড়িয়ে তাঁকে জোর করে মল-মূত্র খাওয়ানো হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
দশ বছর আগের সেই অভিশপ্ত স্মৃতি
শুক্রবার সকালে খবর পেয়ে পুলিশি সহায়তায় মাকে উদ্ধার করেন তাঁর মেয়ে অঞ্জু বর্মন। হাসপাতালে কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি জানান, “দশ বছর আগে আমার বাবাকেও একইভাবে ডাইনি অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে মেরেছিল এই প্রতিবেশীরাই।” হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণাকাতর বৃদ্ধাও একই অভিযোগ করেছেন। প্রশ্ন উঠছে, প্রশাসনের নাকের ডগায় একই পরিবারে দশ বছর পর ফের এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে কী করে?
পুলিশি পদক্ষেপ ও গ্রামের পরিস্থিতি
উত্তর দিনাজপুরের পুলিশ সুপার ডঃ সোনাওয়ানে কুলদীপ সুরেশ জানিয়েছেন, এই ঘটনায় লক্ষ্মী বর্মন ও পান্তো বর্মন সহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। দোষীদের খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছে রায়গঞ্জ থানার পুলিশ। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, ঘটনার পরেও গ্রামের একাংশ একে ‘গ্রামের শুদ্ধিকরণ’ বলে সাফাই দিচ্ছে।
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে এই মধ্যযুগীয় বর্বরতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, শিক্ষার প্রসারের চেয়েও কুসংস্কার দূর করাটা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অভিযুক্তরা কি উপযুক্ত শাস্তি পাবে? নাকি কুসংস্কারের অন্ধকারে হারিয়ে যাবে আরও একটি প্রাণ? এখন সেটাই দেখার।





