টুথপেস্টের পর এবার দুধ, চিনি ও সয়াবিন তেলেও মারণ প্লাস্টিক! শরীরে কী ভয়ংকর সর্বনাশ ডেকে আনছে খাবার?

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি নিয়ে শোরগোলের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার বাংলাদেশের গবেষকরা দুধ, চিনি ও সয়াবিন তেলের মতো অতি প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যেও বিপুল পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি আবিষ্কার করেছেন। নিত্যদিনের খাবার ও পানীয়ের মাধ্যমে মানবদেহে বিষাক্ত প্লাস্টিক কণা প্রবেশের এই ভয়াবহ চিত্র সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি ছোট শিশুরা অজান্তেই প্রতিদিন মারাত্মক পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করছে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০ মিলিলিটার প্রসেসড দুধে গড়ে ১৫৬টির বেশি এবং কাঁচা দুধে প্রায় ৯৩টিরও বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। খামার থেকে শুরু করে প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের পাইপ দিয়ে পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্লাস্টিকের বোতল বা প্যাকেটে সংরক্ষণের প্রতিটি স্তরে দুধ বিষাক্ত প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত তথ্য বলছে, ঢাকার বাজারে উপলব্ধ ব্র্যান্ডেড চিনির প্রতি কেজিতে গড়ে ৩২২টি এবং খোলা চিনির প্রতি কেজিতে প্রায় ৪০৩টি প্লাস্টিক কণা রয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে সয়াবিন তেলের পরীক্ষায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বিইউপি-এর যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, খোলা সয়াবিন তেলে প্রতি লিটারে গড়ে প্রায় ৪৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার এবং বোতলজাত তেলে প্রায় ৪৪ হাজার থেকে ৫৪ হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা লুকিয়ে রয়েছে।

গবেষকদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কেবল সয়াবিন তেলের মাধ্যমেই প্রতিদিন গড়ে ১৭টির বেশি এবং বছরে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার প্লাস্টিক কণা পেটে চালান করছেন। শিশুদের ক্ষেত্রে এই পরিসংখ্যান আরও বেশি ভয়ঙ্কর, কারণ তারা প্রতিদিন প্রায় ৭৭টি অর্থাৎ বছরে প্রায় ২৮ হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছে। প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট, বস্তা, কারখানার ক্ষয়প্রাপ্ত পাইপ এবং পরিবেশের যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য ভেঙে এই ক্ষুদ্র কণাগুলো সরাসরি খাদ্যচক্রে প্রবেশ করছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, ১৩ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট এই কণাগুলো সরাসরি রক্তে মিশে গিয়ে পরিপাকতন্ত্রের জটিলতা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং কোষের দীর্ঘমেয়াদি ও অপূরণীয় ক্ষতি ঘটাতে পারে। পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা প্লাস্টিকের যথেচ্ছ ব্যবহার রোধ করতে এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনার জোরালো পরামর্শ দিয়েছেন।