টলিউডের দীর্ঘদিনের পরিচিত সাংগঠনিক কাঠামোয় বড়সড় পরিবর্তনের ঘোষণা ঘিরে উত্তাল হয়ে উঠল বাংলা চলচ্চিত্র জগত। বুধবার টেকনিশিয়ান্স স্টুডিও প্রাঙ্গণ থেকে বিজেপি বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী ঘোষণা করেন, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ফেডারেশন কাঠামো ভেঙে নতুন সংগঠন গঠন করা হবে। তাঁর এই ঘোষণার মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই টালিগঞ্জে দেখা গেল চরম উত্তেজনা, যা শেষ পর্যন্ত রণক্ষেত্রের চেহারা নিল।
মূল ঘটনার সূত্রপাত বুধবারের সেই বিস্ফোরক ঘোষণা থেকেই। পাপিয়া অধিকারী সাংবাদিক বৈঠকে স্পষ্ট জানান, দীর্ঘদিন ধরে টলিউডের কর্মসংস্কৃতি ও কাজের বণ্টনে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, একাধিক স্তরের ‘ব্যান কালচার’ এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দাপটে প্রকৃত মেধাবী টেকনিশিয়ানরা নিয়মিত কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই একচেটিয়া আধিপত্য ও স্বজনপোষণ রুখতেই ‘ফেডারেশন অফ সিনে টেকনিশিয়ান্স অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া’ ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
একই সঙ্গে তিনি এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের রূপরেখা তুলে ধরেন। ২৬টি ছোট ছোট গিল্ড কমিয়ে মাত্র চারটি বিভাগে নতুন কাঠামো তৈরি করা হবে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশান পিকচার্স অ্যান্ড কালচারাল কনফেডারেশন’ (EIMPCC)। পাপিয়া অধিকারীর দাবি, নতুন এই কাঠামোর মাধ্যমে টলিউডে স্বচ্ছতা ফিরবে এবং কেবল যোগ্যতার ভিত্তিতেই কাজ বণ্টন হবে। তিনি আরও ঘোষণা করেন, ইন্ডাস্ট্রিতে ‘SIR’ প্রক্রিয়া চালু করা হবে, যার মাধ্যমে যাচাই করা হবে কে প্রকৃত টেকনিশিয়ান এবং কারা পিছনের দরজা দিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে প্রবেশ করেছেন। অযোগ্য ও অবৈধদের চিহ্নিত করে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
এই ঘোষণার পরেই টলিপাড়ায় প্রতিক্রিয়া হয়ে ওঠে তীব্র। একদিকে সংস্কারপন্থীরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও, অন্যদিকে সংগঠনের পুরনো অনুগতরা একে অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য নষ্ট করার গভীর চক্রান্ত বলে মনে করছেন। বুধবারের পর থেকেই স্টুডিও পাড়ায় চাপা উত্তেজনা ছিল, যা বৃহস্পতিবার দুপুরে ভয়াবহ আকার নেয়। টেকনিশিয়ান্স স্টুডিও চত্বরে নতুন বনাম পুরনো সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে শুরু হয় তুমুল বচসা। মুহূর্তের মধ্যে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। দুই পক্ষের মধ্যে ইটবৃষ্টি এবং ডিম ছোড়াছুড়ির মতো ঘটনা ঘটে, যার ফলে এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রিজেন্ট পার্ক থানার পুলিশকে বিশাল বাহিনী নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে হয়। পুলিশ দুই পক্ষকে ছত্রভঙ্গ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এই সংঘর্ষের পর থেকেই এলাকায় পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, পাপিয়া অধিকারী বিদায়ী সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের সময়কালের বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম নিয়েও তদন্তের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি জানান, ইতিমধ্যে এই সংক্রান্ত বিস্তারিত রিপোর্ট রাজ্য সরকারের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, দুই টেকনিশিয়ানের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ জমা পড়েছে, যাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। এই রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক টানাপোড়েন টলিপাড়াকে কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে। আগামী দিনে এই সংঘাত কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।





