জাপানে প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্পের পরেই শপিং মল ধসে ভয়াবহ বিস্ফোরণ! মৃত্যুমিছিল দেখে শিউরে উঠছে বিশ্ব

জাপানের জনবহুল কিউশু দ্বীপের কুমামোতো প্রদেশে আঘাত হানা এক প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্পের জেরে মৃতের সংখ্যা হুহু করে বেড়েই চলেছে। জাপানের চারটি প্রধান দ্বীপের মধ্যে তৃতীয় বৃহত্তম এই দ্বীপে ভূকম্পনের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে নিমেষেই বহু বহুতল ও বসতিপূর্ণ বাড়িঘর ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। বিশেষ করে একটি বিশাল শপিং মলের একাংশ হঠাৎ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ার পর সেখানে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে, যার ফলে অধিকাংশ মানুষের প্রাণহানির মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। প্রধান ভূমিকম্পের পর ওই এলাকায় পরপর প্রায় ১০০টি শক্তিশালী আফটারশক অনুভূত হয়েছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে চরম আতঙ্ক তৈরি করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করা হলেও পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া কুমামোতোর এই শপিং মলটির ইতিহাস অত্যন্ত বেদনাদায়ক। জানা গেছে, ঠিক এই মলটিই এর আগে ২০১৬ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে পুনর্নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করে মাত্র গত মাসেই সেটিকে নতুন করে জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল, আর তার মধ্যেই এই পুনরাবৃত্তি মানুষের বুক কাঁপিয়ে দিয়েছে। একইসঙ্গে এলাকার একটি বৃহৎ কাগজ কারখানাও সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, যার ভেতরে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে টানা বেশ কয়েকদিন ধরে জোরদার তল্লাশি অভিযান চালিয়েছে উদ্ধারকারী দল। বিপন্ন হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সরকারিভাবে তৈরি করা বিভিন্ন অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে। তবে চরম দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, ওই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত জল বা বিদ্যুৎ সরবরাহের কোনো ব্যবস্থা নেই। তার ওপর আবার দিন দিন তাপমাত্রা যেভাবে চড়চড় করে বাড়ছে, তাতে সাধারণ মানুষের কষ্ট চরমে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত এয়ার কন্ডিশনার বা এসি বসানোর বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রায় ৩০,০০০ এরও বেশি বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে, যার জেরে সাধারণ মানুষের মধ্যে হিটস্ট্রোকের আশঙ্কা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু আধুনিক স্থাপনাই নয়, ঐতিহাসিক কুমামোতো দুর্গও এই জোরালো ভূকম্পনের ধাক্কায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা ২০১৬ সালের ভূমিকম্পেও ব্যাপকভাবে ভেঙে পড়েছিল। এদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরপরই উপকূলবর্তী অঞ্চলে সুনামি সতর্কতা জারি করা হলেও, পরবর্তীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক বুঝে তা তুলে নেওয়া হয়।
জাপানের এই ভূমিকম্পের আতঙ্কের রেশ কাটতে না কাটতেই অপরপ্রান্তে ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও প্রকৃতি তার উগ্র রূপ ধারণ করেছে। জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল এবং ক্রিটের মতো ইউরোপীয় দেশগুলোর বিস্তীর্ণ জঙ্গল এলাকায় ভয়াবহ দাবানল দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। আবহাওয়া ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাষায় জানিয়েছেন যে, ইউরোপের ইতিহাসে এর আগে এমন ধ্বংসাত্মক ও ভয়ঙ্কর দাবানল কখনোই দেখা যায়নি। যদিও সপ্তাহ শেষের দিকে এসে ফ্রান্স ও স্পেনের কিছু অংশে আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে, তবে গ্রিস ও ইতালি জুড়ে নতুন করে চরম সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়ে চলতে থাকা লাগাতার জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবের ফলেই ইউরোপে বারবার এমন মর্মান্তিক দাবানলের ঘটনা ঘটছে।
এই ভয়াবহ দাবানলের ভয়াবহতা বোঝাতে বিজ্ঞানীরা একে একটি পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতার সঙ্গে তুলনা করছেন। এমনকি এই প্রকাণ্ড আগুন থেকে আকাশে ‘ফায়ার ক্লাউড’ বা তথাকথিত ‘আগুনে মেঘ’ তৈরি হওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্যও সামনে এসেছে। ফ্রান্সের বর্দো-সহ ইউরোপের একাধিক এলাকায় এই বিরল ও ভয়ঙ্কর মেঘ স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। দাবানলের তীব্র গরমে উৎপন্ন হওয়া প্রচণ্ড উত্তপ্ত বাতাস যখন বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরের ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শে আসে, তখন তা ঘনীভূত হয়ে দানবাকৃতি বজ্রগর্ভ মেঘের সৃষ্টি করে। এই অস্বাভাবিক মেঘ থেকে পরবর্তীতে আকস্মিক ঝড়, প্রবল বৃষ্টিপাত এবং বজ্রপাতের মতো ঘটনা ঘটে, যাকে বিজ্ঞানীরা ‘আগুনে মেঘ’ বলে অভিহিত করছেন। এর আগে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন দাবানলে এমন ঘটনার সাক্ষী থেকেছেন গবেষকরা, তবে ইউরোপের মাটিতে এটি প্রথমবার কি না, তা নিয়ে বর্তমানে গভীর গবেষণা চলছে। এই ভয়াবহ দাবানলের আগুনে গ্রিসে ইতিমধ্যে তিনজন বীর দমকলকর্মী তাঁদের প্রাণ হারিয়েছেন। অন্যদিকে ফ্রান্সে প্রায় ১,৬০,০০০ হেক্টর বনাঞ্চল পুড়ে সম্পূর্ণ ছাই হয়ে গেছে, যা বিগত সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। চলতি বছরে পরিস্থিতি এত বেশি হিংস্র ও ভয়াবহ হয়ে ওঠার মূল কারণ হিসেবে বিশ্ব উষ্ণায়নকেই একবাক্যে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা, যা নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে বিন্দুমাত্র দ্বিমত নেই। চলতি বছরে ফ্রান্স ও স্পেনের মতো দেশগুলোতে শীতের মরশুমে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিপাত হওয়ায় ব্যাপক গাছপালা ও সবুজ জন্মেছিল। কিন্তু তার ঠিক পরেই যখন অস্বাভাবিক ও তীব্র গরম পড়তে শুরু করে, তখন সেই অতিরিক্ত গরমে সমস্ত গাছপালা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। ফলস্বরূপ, সামান্য আগুনের স্ফুলিঙ্গেই তা দাবানলের রূপ নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা এতটাই যে, এই আগুন সম্পূর্ণ নিভিয়ে নিয়ন্ত্রণে আনতে আগামী কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দাবানলের ফলে সৃষ্ট মাত্রাতিরিক্ত দূষণের বিষাক্ত প্রভাবে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১,০০,০০০ মানুষের আকস্মিক মৃত্যু ঘটছে। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বহুবিধ সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। লোকালয় ও শহরের অত্যন্ত কাছাকাছি দাবানল ছড়িয়ে পড়ায় সেখানকার সমৃদ্ধ পর্যটন শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে স্থানীয় অর্থনীতিকে দীর্ঘ সময় লড়াই করতে হবে। ইউরোপীয়রা সাধারণত বাড়িঘরে অতিরিক্ত গরমের জন্য এয়ার কন্ডিশনার বা এসি ব্যবহারে সেভাবে অভ্যস্ত ছিলেন না, কিন্তু পরিবর্তিত আবহাওয়ার চরম মারের কারণে বর্তমানে তাঁরা বাধ্য হয়ে দলে দলে এসি কিনছেন। এর ফলে ইউরোপের বাজারে চীনা ব্র্যান্ডের সস্তা এসির রমরমা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশীয় প্রস্তুতকারক ও উৎপাদকদের সুরক্ষার স্বার্থে বেশ কয়েকটি দেশে নতুন করে ভারী কর বা শুল্ক বসানোর হুমকি তৈরি করেছে। ফলস্বরূপ, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অভিঘাত আন্তর্জাতিক বাজারে এক নতুন জটিল সংকটের জন্ম দিচ্ছে।