জাতপাত ও পরিবারতন্ত্রের যুগ শেষ! বিহারের রাজনীতিতে কোন জাদুকরী ফর্মুলায় বাজিমাত করলেন প্রশান্ত কিশোর?

বিহারের রাজনীতি মানেই এতদিন ধরে জাতপাত, ধর্মীয় মেরুকরণ আর পরিবারতন্ত্রের এক দীর্ঘস্থায়ী খেলা বলে মনে করা হতো। কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সেই চিরাচরিত রাজনৈতিক সমীকরণকে একটিমাত্র উপনির্বাচনেই সম্পূর্ণভাবে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলেন বিশিষ্ট নির্বাচনী কৌশলবিদ তথা ‘জন স্বরাজ পার্টি’-র প্রধান প্রশান্ত কিশোর (Prashant Kishor)। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে বেরিয়ে তিনি যেভাবে বিহারের মাটি ও মানুষের মন জয় করেছেন, তা আগামী দিনের রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।

ঐতিহ্যগতভাবে বিহারের রাজনীতিতে প্রার্থীর নিজস্ব জাত বা সামাজিক পরিচয়ই যে কোনো নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের প্রধান নির্ণায়ক হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু প্রশান্ত কিশোর দক্ষিণী রাজনীতির আদলে তাঁর প্রচারের মূল ফোকাস সম্পূর্ণ বদলে দেন। তিনি বারবার প্রচারের মঞ্চ থেকে একটাই স্লোগান তোলেন— “জাতপাতের পরিচয় ভুলে ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ, মানসম্মত শিক্ষা আর নিশ্চিত চাকরির জন্য ভোট দিন।” তাঁর এই জাতপাতহীন রাজনীতির বার্তা রাজ্যের তরুণ প্রজন্ম ও নিরপেক্ষ ভোটারদের মনে গভীর আশার সঞ্চার করে।

এই জয়ের পেছনে অন্যতম বড় অনুঘটক ছিল বর্তমান প্রজন্মের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও ছাত্র আন্দোলন। NEET পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং দেশজুড়ে প্রতিবাদী ছাত্রদের ওপর দমনপীড়নের ঘটনা বিহারের যুবসমাজকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। তীব্র বেকারত্ব এবং লাগাতার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় ক্ষুব্ধ Gen-Z এবং বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের এই ক্ষোভকে প্রশান্ত কিশোর অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক প্রচারে কাজে লাগান। পর্দার পিছনের ভোট কুশলী থেকে সরাসরি মাঠের লড়াকু নেতা হয়ে উঠতে তিনি প্রায় ৩,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ পদযাত্রা সম্পন্ন করেন এবং মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যান।

পাশাপাশি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারেও পিছিয়ে ছিল না তাঁর দল। জন স্বরাজ পার্টির শক্তিশালী আইটি সেল ইনস্টাগ্রাম রিলস, ইউটিউব শর্টস এবং হোয়াটসঅ্যাপ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে শাসকদলের বিগত ২০ বছরের প্রশাসনিক খামতি ও দুর্নীতির খতিয়ান সহজ-সরল ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। বাঁকিপুর বিধানসভা কেন্দ্রের দীর্ঘদিনের বিধায়ক তথা বিজেপির বর্ষীয়ান নেতা নিতিন নবীন রাজ্যসভায় নির্বাচিত হওয়ায় আসনটি শূন্য হয়। গত দুই দশকে এলাকার অমীমাংসিত সমস্যা এবং বেহাল পরিকাঠামো সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছিল। অন্যদিকে, প্রথাগত বিরোধী দল আরজেডি (RJD)-র ওপরও মানুষের বিশ্বাস তলানিতে ঠেকেছিল। এই রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে প্রশান্ত কিশোর নিজেকে জনগণের সামনে এক অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও বিকল্প শক্তি হিসেবে সফলভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হন।