জন্তর মন্তর থেকে দূরে পিকে! অথচ সেই ছাত্র আন্দোলনের সুবাদেই কি বিহারের উপনির্বাচনে বাজিমাত করতে চলেছেন প্রশান্ত কিশোর?

দিল্লির যন্তর মন্তরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে চলা ছাত্র বিক্ষোভ যখন ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে, তখন এই আন্দোলন থেকে সুকৌশলে দূরত্ব বজায় রেখে চলেছেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক কৌশলবিদ থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া প্রশান্ত কিশোর ওরফে পিকে। যেখানে বিরোধীরা এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ছাত্রসমাজ জাতীয় রাজধানীতে একত্রিত হয়ে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছে, সেখানে পিকে আপাতত নিজের নির্বাচনী সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত বিহারের মাটিতে। বর্তমানে বিহারের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে বাঁকিপুর বিধানসভা উপনির্বাচন, যেখান থেকে জন সুরাজ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে প্রথমবার সরাসরি নির্বাচনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন প্রশান্ত কিশোর।

দীর্ঘদিন ধরে পর্দার আড়ালে রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের পর এবার খোদ মাঠে নেমে নিজের প্রথম রাজনৈতিক বিজয় নিশ্চিত করতে মরিয়া পিকে। এই উপনির্বাচনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কারণ ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) হেভিওয়েট নেতা তথা জাতীয় সভাপতি নিতিন নবীন এই আসনটির বিধায়ক ছিলেন। সম্প্রতি তিনি রাজ্যসভায় নির্বাচিত হওয়ার কারণে বাঁকিপুর বিধানসভা কেন্দ্রটি খালি হয়ে যাওয়ায় সেখানে আগামী ৩০শে জুলাই ভোটগ্রহণ এবং আগামী ৩রা আগস্ট ভোট গণনা নির্ধারিত হয়েছে। এই হাই-ভোল্টেজ নির্বাচনে জয়লাভ করতে প্রশান্ত কিশোর এখন পুরোপুরি মনোযোগ নিবদ্ধ করেছেন বাঁকিপুরের স্থানীয় সমীকরণ এবং ছাত্রসমাজের ক্ষোভকে কাজে লাগানোর ওপর।

দিল্লির যন্তর মন্তরে না গেলেও, সম্প্রতি পাটনায় এক প্রতিবাদী কর্মসূচির সময় পুলিশের লাঠিচার্জে গুরুতর আহত হওয়া বেশ কয়েকজন ছাত্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছেন প্রশান্ত কিশোর। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ওই আহত ছাত্রদের অনেকেই সরাসরি বাঁকিপুর বিধানসভা কেন্দ্রের বাসিন্দা। বাঁকিপুরে যখন নির্বাচনী প্রচার তুঙ্গে, ঠিক সেই সময় ওই ছাত্রছাত্রীরা পিকে-র নির্বাচনী মঞ্চে এসে উপস্থিত হন এবং অত্যন্ত জোরালো ভাষায় উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার আর্জি জানান।

প্রশান্ত কিশোরও অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে পাটনার পুলিশি লাঠিচার্জের ঘটনাকে সরাসরি বাঁকিপুর উপনির্বাচনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে শুরু করেছেন। তাঁর দল ও প্রচার শিবিরের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে, ছাত্রছাত্রীদের ওপর হওয়া এই নির্বিচারে পুলিশি অত্যাচারের উপযুক্ত জবাব বাঁকিপুর বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে বিজেপির ভরাডুবি ও পরাজয়ের মাধ্যমেই দেওয়া হবে। পিকে-র নির্বাচনী মঞ্চে দাঁড়িয়ে এক আহত ছাত্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন যে, পুলিশি লাঠিচার্জে বহু ছাত্রের হাত-পা ভেঙে গেছে এবং তাঁদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়েছে। ওই ছাত্র আরও বলেন, দেশের তরুণ সমাজ আর বর্তমান বিজেপি সরকারকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না, বরং এই রাজনৈতিক শক্তির সম্পূর্ণ অবসান ঘটাতে চায়। অন্য এক ছাত্র সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে বলেন যে, কেউ যেন আর ভুল করেও বিজেপির সঙ্গে যুক্ত না থাকে এবং বাঁকিপুর আসন থেকে বিপুল ভোটে প্রশান্ত কিশোরকে জয়ী করে বিধানসভায় পাঠায়।

ছাত্রদের এই তীব্র ক্ষোভকে হাতিয়ার করে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়ে প্রশান্ত কিশোর বলেন যে, সরকার যদি দেশের কোমলমতি শিশুদের এবং পরীক্ষার্থীদের ওপর এভাবে আক্রমণ চালায়, তবে যে তরুণ সমাজ এবং অভিভাবকরা একসময় নরেন্দ্র মোদীকে প্রধানমন্ত্রী বানানোর জন্য ভোট দিয়েছিলেন, তারাই আজ সরকারের পদত্যাগ দাবি করতে বাধ্য হবেন। যুবসমাজ ইতিমধ্যে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করেছে। পিকের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, সরকার যদি দুর্নীতিবাজ শিক্ষা মাফিয়াদের আড়াল করতে থাকে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তবে দেশের যুবসমাজ সম্পূর্ণভাবে বর্তমান শাসক দলের বিরুদ্ধে চলে যাবে।

তিনি আরও দাবি করেন যে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই ক্ষোভ এবং প্রতিবাদ কেবল দিল্লির যন্তর মন্তরেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং দেশের প্রতিটি কোণে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ যেভাবে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর হওয়া পুলিশি বর্বরতার নিন্দা করছেন, তার সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রভাব শুধু বিহারের বাঁকিপুরেই নয়, বরং ব্যাঙ্গালুরু, কেরালা এবং গুজরাটের মতো অঞ্চলেও স্পষ্টভাবে অনুভূত হবে। যদিও প্রশান্ত কিশোর কৌশলগতভাবে যন্তর মন্তরের মূল আন্দোলন থেকে নিজেকে একপ্রকার দূরে সরিয়ে রেখেছেন, তবুও বাঁকিপুর উপনির্বাচনের ভোটের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, দেশজুড়ে তৈরি হওয়া এই শক্তিশালী ছাত্র আন্দোলনের আবহকে তিনি নিজের রাজনৈতিক প্রচারের প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে কোনো ভুল করছেন না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্র অসন্তোষকে পুঁজি করে পিকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম নির্বাচনী লড়াইয়ে বড় কোনো চমক দিতে পারেন কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।