চিকিৎসা বিজ্ঞানে এমন গাফিলতি দেখেছেন? ভাঙা পা বাদ দিয়ে সোজা সুস্থ পায়ে অস্ত্রোপচার! শেষমেশ আদালতে কী শাস্তি হলো ডাক্তারের?

বিহারের সিওয়ান জেলায় চিকিৎসকদের চরম গাফিলতি ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার এক অবিশ্বাস্য ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে, যা শুনে শিউরে উঠছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে চিকিৎসা মহলের প্রতিনিধিরাও। রোগীর ডান পায়ে ফ্র্যাকচার বা ভাঙা অংশ থাকা সত্ত্বেও ভুলবশত তাঁর সম্পূর্ণ সুস্থ বাম পায়ে অস্ত্রোপচার করার মতো মারাত্মক ভুল করেন এক চিকিৎসক। এই চাঞ্চল্যকর ও নজিরবিহীন চিকিৎসা ত্রুটির অভিযোগে জেলা ভোক্তা বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন ওই চিকিৎসককে সম্পূর্ণভাবে দায়ী করেছে এবং শাস্তি হিসেবে ভুক্তভোগী রোগীকে ক্ষতিপূরণ বাবদ অবিলম্বে ৮ লক্ষ টাকা প্রদানের কঠোর নির্দেশ দিয়েছে।

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, জানকী কুনওয়ার নামক এক রোগী তাঁর ডান পায়ে মারাত্মক ফ্র্যাকচার নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। নিয়মমাফিক এক্স-রে করার পর চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে তাঁকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যজনক ও দুঃখজনকভাবে, আসল সমস্যাটি ডান পায়ে থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসক ভুল করে তাঁর বাম পায়ে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন। রোগীর পরিবার এই ভয়াবহ ভুল দেখতে পেয়ে তৎক্ষণাৎ তীব্র আপত্তি ও প্রতিবাদ জানায়। পরিবারের প্রতিবাদের মুখে পড়ে চিকিৎসক নিজের ভুল ঢাকতে এরপর জোর করে তাঁর আসল আঘাতপ্রাপ্ত ডান পায়েও দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচার করতে বাধ্য হন। এই অমানবিক ও দায়িত্বহীন আচরণের জেরে ওই বৃদ্ধা রোগী শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েন।

এরপর ন্যায়বিচারের আশায় ভুক্তভোগী জানকী কুনওয়ার জেলা ভোক্তা বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের দ্বারস্থ হন এবং আইনি লড়াই শুরু করেন। আদালতের সামনে অভিযোগকারী রোগী তাঁর দাবির পক্ষে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে সমস্ত প্রাসঙ্গিক চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি, এক্স-রে রিপোর্ট, মূল এক্স-রে প্লেট, হাসপাতাল থেকে দেওয়া ডিসচার্জ স্লিপ, তদন্ত প্রতিবেদন এবং পূর্বে পাঠানো আইনি নোটিশের কপি জমা দেন। অন্যদিকে, অভিযুক্ত চিকিৎসকের পক্ষ থেকে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে মামলাটি সম্পূর্ণ খারিজ করে দেওয়ার আবেদন জানানো হয়। তবে কমিশন উভয় পক্ষের আইনজীবীদের সমস্ত যুক্তিতর্ক অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে শোনে এবং উপস্থাপিত সমস্ত নথিপত্র ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখে।

উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে কমিশন এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, এই সম্পূর্ণ ঘটনাটি নিছক কোনো ভুল নয়, বরং চিকিৎসাক্ষেত্রে চরম অবহেলা এবং দায়িত্বে মারাত্মক ঘাটতির এক নগ্ন রূপ। কমিশন স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করে যে, রোগীর আসল আঘাত ও ভাঙা অংশ ডান পায়ে থাকা সত্ত্বেও অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল সম্পূর্ণ সুস্থ বাম পায়ে এবং পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে ডান পায়ে ছুরি চালানো হয়। এই ধরনের চরম গাফিলতি মানুষের মৌলিক অধিকার এবং চিকিৎসার বিশ্বাসের ওপর সরাসরি আঘাত হানে। ফলস্বরূপ, কমিশন অভিযোগকারীর পক্ষেই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করে। আর্থিক ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি ওই চিকিৎসককে মানসিক ও শারীরিক কষ্টের জন্য অতিরিক্ত ২০,০০০ টাকা এবং মামলা পরিচালনার খরচ বাবদ আরও ৫,০০০ টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ আগামী দিনে রুখতে এই রায় এক কঠোর বার্তা দেবে বলেই মনে করছেন আইনি বিশেষজ্ঞরা।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty