চাপের বোঝা না কি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ? নিট রি-টেস্টের মুখে দেশজুড়ে শোক, ঝরল আরও দুই প্রাণ

আজকের নিট-ইউজি পুনঃপরীক্ষাকে ঘিরে যখন গোটা দেশের ২২ লক্ষ পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন, ঠিক তখনই এল এক অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক খবর। পরীক্ষার ঠিক আগের দিন দেশের দুটি প্রান্তে আত্মঘাতী হলেন দুই নিট পরীক্ষার্থী। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার কঠিন চাপ এবং গত কয়েক মাস ধরে চলা প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষা বাতিলের অনিশ্চয়তা যে কোমলমতি পড়ুয়াদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কতটা গভীর ক্ষত তৈরি করেছে, এই দুই মৃত্যু যেন তারই এক রক্তিম দলিল।
প্রথম ঘটনাটি ঘটেছে হায়দরাবাদের মিয়াপুরে। মৃত ১৯ বছর বয়সী শেখ সানা দীর্ঘ দিন ধরেই নিটের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। দুই বোনের সঙ্গে থেকে পড়াশোনা করতেন তিনি। পরিবার সূত্রে খবর, সানার বাবা কর্মসূত্রে কুয়েতে থাকেন এবং মা সম্প্রতি বাইরে গিয়েছেন। রবিবার দ্বিতীয় দফার পরীক্ষার ঠিক আগের দিন তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি ইংরেজি নোট উদ্ধার করেছে, যেখানে লেখা রয়েছে—তাঁর মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নন। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ, পরিবারের উচ্চ প্রত্যাশা এবং বারবার ব্যর্থতার ভয় সম্ভবত তাঁর মানসিক স্থিতিকে ভেঙে দিয়েছিল।
দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটেছে উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে। বিজয়নগরের বাসিন্দা ২২ বছর বয়সী যতীন কুমার দীর্ঘ দিন ধরেই ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। শুক্রবার সকালে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান। পুলিশের দাবি, যতীনের মোবাইল থেকে একটি ভিডিও উদ্ধার হয়েছে, যা তিনি মৃত্যুর ঠিক আগে রেকর্ড করেছিলেন। ভিডিওতে তিনি পুনঃপরীক্ষার চাপের কথা অস্বীকার করলেও, তাঁর অকাল প্রয়াণ স্থানীয় এলাকায় শোকের ছায়া ফেলেছে। লখনউয়ের সুহানি যাদবের মতো তিনিও সম্ভবত পরীক্ষার অনিশ্চয়তা ও মানসিক অবসাদের শিকার।
প্রসঙ্গত, মে মাসের নিট-ইউজি পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর থেকেই গোটা দেশে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা চলছে। বিষয়টি এখন সিবিআইয়ের তদন্তাধীন। যদিও ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ-র তরফে দাবি করা হচ্ছে, রবিবারের পুনঃপরীক্ষার জন্য নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং দেশজুড়ে ‘মক ড্রিল’ চালানো হয়েছে, কিন্তু পড়ুয়াদের মনে যে বিশ্বাস ভঙ্গের ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা মেটানো সহজ নয়।
মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার আকাশছোঁয়া প্রতিযোগিতার পাশাপাশি বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার এই অস্থিরতা ছাত্রছাত্রীদের আত্মবিশ্বাসকে তলানিতে নামিয়ে দিচ্ছে। একটা পরীক্ষা বাতিল হওয়া মানেই যে তাদের পরিশ্রম বৃথা গেল—এই চিন্তার রেশ তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করছে। একের পর এক পরীক্ষার্থীর মৃত্যুতে আজ অভিভাবকমহলে প্রশ্ন উঠছে—ডাক্তার তৈরির ইঁদুর দৌড়ে আমরা কি তবে মেধাবী সন্তানদের হারিয়ে ফেলছি? সরকারি উদ্যোগ এবং সুরক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি পড়ুয়াদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া যে কতটা জরুরি, তা এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। নিট রি-টেস্টের এই অগ্নিপরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে দেশের প্রতিটি পরীক্ষার্থীর নিরাপত্তা ও মানসিক শান্তিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।