“গাড়ির ব্যাটারি চার্জ করতে থামতে হবে না!”-চোখের পলকে ফুল চার্জ করার উপায় আনছে বিজ্ঞান

প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ব্যাটারির আকার যত বড় হবে, সেটিকে পুরোপুরি চার্জ করতে সময়ও তত বেশি লাগবে। ল্যাপটপ চার্জ হতে যেখানে কয়েক ঘণ্টা সময় নেয়, সেখানে বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইভি (EV)-এর ব্যাটারি ভরতে রাতের পর রাত অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার কোয়ান্টাম জগতে পদার্থবিজ্ঞানের এই চিরাচরিত নিয়ম সম্পূর্ণ উল্টে গেছে। বিজ্ঞানীরা এমন এক যুগান্তকারী আবিষ্কারের দোরগোড়ায় পৌঁছেছেন, যেখানে ব্যাটারির আকার বা উপাদানের সংখ্যা যত বাড়বে, সেটি চার্জ নেওয়ার গতিও তত দ্রুত হবে।

অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থা সিএসআইআরও (CSIRO)-এর গবেষকরা কোয়ান্টাম প্রযুক্তির হাত ধরে বিশ্বের প্রথম কার্যকর কোয়ান্টাম ব্যাটারির প্রোটোটাইপ তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। প্রচলিত রাসায়নিক ব্যাটারির বিপরীতে এই নতুন প্রযুক্তির সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এটি আকারে বড় হলেও নিমেষে চার্জ হতে সক্ষম।

কীভাবে কাজ করে এই কোয়ান্টাম ব্যাটারি?

সাধারণ ব্যাটারিগুলো দুই শতাব্দীরও বেশি পুরোনো ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল বা রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু জেমস কোয়াচের নেতৃত্বাধীন অস্ট্রেলীয় গবেষক দলটি এই প্রক্রিয়ার পরিবর্তে কোয়ান্টাম প্রভাবকে কাজে লাগিয়েছেন। অপটিক্যাল মাইক্রোক্যাভিটি প্রযুক্তির মাধ্যমে দুটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র আয়নার মাঝে জৈব রঞ্জক অণু রেখে তাতে লেজার রশ্মি প্রয়োগ করা হয়। এর ফলে আলো ও অণুর মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ তৈরি হয়, যাকে বলা হচ্ছে ‘সুপারঅ্যাবসর্পশন’।

এই সুপারঅ্যাবসর্পশনের কারণেই কোয়ান্টাম ব্যাটারি প্রচলিত ব্যাটারির তুলনায় অনেক বেশি দক্ষভাবে কাজ করতে পারে। কণাগুলো এখানে একে অপরের সঙ্গে মিলে সমন্বিতভাবে শক্তি শোষণ করে। গবেষকদের তৈরি বর্তমান প্রোটোটাইপটি ফেমটোসেকেন্ডের (সেকেন্ডের এক কোয়াড্রিলিয়ন ভাগের এক ভাগ) মধ্যে চার্জ হতে পেরেছে। ২০২৬ সালের মার্চে এই দল প্রোটোটাইপ থেকে বৈদ্যুতিক প্রবাহ সফলভাবে বের করতেও সক্ষম হয়েছে।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ:

যদিও প্রযুক্তিটি এখনো একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এটি খুব সামান্য পরিমাণ শক্তি মাত্র কয়েক ন্যানোসেকেন্ড ধরে রাখতে পারে, তবুও এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী বিজ্ঞানীরা। গবেষক জেমস কোয়াচ আশা প্রকাশ করেছেন যে, ভবিষ্যতে কক্ষ তাপমাত্রাতেই এই ব্যাটারি কাজ করবে। এমনকি লেজারের সাহায্যে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে চলন্ত অবস্থাতেই বৈদ্যুতিক গাড়ি চার্জ দেওয়া সম্ভব হতে পারে, যার ফলে গাড়ি চার্জিংয়ের জন্য আলাদা করে আর থামার প্রয়োজন পড়বে না।

তবে এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে বেশ কিছু সংশয়ও রয়েছে। কোয়ান্টাম প্রভাব অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় বাইরের পরিবেশের সামান্য হস্তক্ষেপে তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তা সত্ত্বেও, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং ভবিষ্যতের শক্তি সঞ্চয়ের ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে এই কোয়ান্টাম ব্যাটারি যে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে চলেছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।