গমের দাম তলানিতে, তবুও বাজারে কেন আগুন দর? রুটির দাম না কমার পিছনে কাজ করছে কোন অদৃশ্য শক্তি?

অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম বলে, কাঁচামালের দাম কমলে উৎপাদিত পণ্যের দামও কমবে। অর্থাৎ, পাইকারি বাজারে গমের দাম কমলে পাড়ার দোকান বা সুপারমার্কেটে আটার প্যাকেট সস্তা হওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে ভারতের বাজারে এক অদ্ভুত ও বৈপরীত্যপূর্ণ ছবি ধরা পড়েছে। দেশজুড়ে গমের পাইকারি দর উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও খুচরো বাজারে আটা বা রুটির দামে তার বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়েনি। উল্টে কৃষকরা যেমন ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না, তেমনই চড়া দামে আটা কিনতে গিয়ে পকেটে টান পড়ছে সাধারণ মানুষের।

গমের দাম কি সত্যিই কমেছে? কেন্দ্রীয় কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক মাসগুলিতে গমের দাম অনেকটাই নিম্নমুখী। মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ এবং রাজস্থানের মতো বড় রাজ্যগুলির পাইকারি মান্ডিতে এপ্রিল মাসে প্রতি কেজি গম ২৩ থেকে ২৫ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দাম নরেন্দ্র মোদী সরকারের নির্ধারিত ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের (MSP) থেকেও কম। ২০২৫ সালে কেন্দ্র গমের এমএসপি বাড়িয়ে কুইন্টাল প্রতি ২৫৮৫ টাকা (কেজি প্রতি ২৫.৮৫ টাকা) করলেও কৃষকরা মান্ডিতে বাধ্য হয়ে তার চেয়েও কম দামে ফসল বিক্রি করছেন।

খুচরো বাজারে কেন চড়া দর? পাইকারি বাজারে গমের দাম কম থাকলেও খুচরো দোকানে কিন্তু ছবিটা উল্টো। বর্তমানে বাজারে খোলা আটার দাম কেজি প্রতি ৩৬ থেকে ৪০ টাকার আশেপাশে। অন্যদিকে, ব্র্যান্ডেড প্যাকেটজাত আটার দাম তো আরও বেশি—কেজি প্রতি ৪০ থেকে ৫০ টাকা, কোথাও আবার তার থেকেও বেশি।

ইন্ডিয়া টুডে-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কৃষি বিশেষজ্ঞ ওম প্রকাশ জানিয়েছেন, গমের দাম কমলে আটার দাম কমাটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা না হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে—মুনাফা কার ঘরে যাচ্ছে? বিশেষজ্ঞের মতে, এর ফলে কৃষকের লোকসান হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু গ্রাহকের কোনো লাভ হচ্ছে না। মাঝখান থেকে লাভ লুটে নিচ্ছে একদল মধ্যস্বত্বভোগী বা ‘ফড়ে’ এবং বড় কোম্পানিগুলি।

অদৃশ্য হাত ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট গমের ক্ষেত থেকে আটার প্যাকেট হয়ে রান্নাঘরে পৌঁছাতে বেশ কয়েকটি ধাপ পার করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে পরিবহন, মাড়াই, প্যাকেজিং এবং ব্র্যান্ডিং। প্রতিটি স্তরেই খরচ বাড়ে। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় কল মালিক ও কোম্পানিগুলো যখন উৎপাদন খরচ বাড়ে, তখন দ্রুত তার বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়। কিন্তু কাঁচামালের দাম কমলে তারা সেই সুবিধা সাধারণ মানুষকে দিতে চায় না।

আসল সমস্যা কোথায়? বর্তমানে সরকারি ভাণ্ডারে ২২ মিলিয়ন টনেরও বেশি গমের মজুত রয়েছে। পাশাপাশি ফলনও হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ। এর ফলে মান্ডিতে প্রচুর সরবরাহ থাকলেও কৃষকরা ঘাম ঝরানো ফসলের সঠিক দাম পাচ্ছেন না। ওম প্রকাশ বলেন, “মান্ডিতে নামমাত্র দামে গম বিক্রি হচ্ছে, অথচ শপিং মলে ক্রেতাদের চড়া দাম দিতে হচ্ছে। কৃষকের এই ক্ষতি গ্রাহকের সঞ্চয় হচ্ছে না, বরং তা জমা হচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী এবং নামী সংস্থাগুলোর লাভের ঘরে।”

ফলে আটা বা রুটি সস্তা হওয়ার যে আশা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো করেছিল, তা আপাতত বড় বড় কোম্পানি আর ফড়েদের মুনাফার আড়ালেই ঢাকা পড়ে থাকছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন একটাই—কবে কমবে আটার দাম? নাকি কৃষকের মতো তাঁদেরও এই চড়া দরের বোঝা বয়ে যেতে হবে?

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy