কোডিংয়ের খরচ নেই, নেই কোনো বাধা! ডিপসিক (Deepseek) এআই-কে কাজে লাগিয়ে সর্বনাশা সাইবার যুদ্ধের ফাঁদ পাতার বিস্ফোরক তথ্য ফাঁস!

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI প্রযুক্তির অগ্রগতি একদিকে যেমন মানবসভ্যতাকে আধুনিকতার নতুন শিখরে পৌঁছে দিয়েছে, তেমনই এর অন্ধকার দিকটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক। সম্প্রতি সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি চাঞ্চল্যকর আন্তর্জাতিক রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছে যে, হ্যাকাররা এখন অত্যন্ত সুকৌশলে চিনের অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং শক্তিশালী ‘ডিপসিক’ (Deepseek) এআই মডেলকে হাতিয়ার বানিয়ে বিশ্বজুড়ে মারাত্মক সব সাইবার হামলা চালাচ্ছে। এই বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার সুরক্ষা মহলে চরম শোরগোল শুরু হয়েছে।

তাইওয়ানের স্বনামধন্য সাইবার সিকিউরিটি রিসার্চ অর্গানাইজেশন ‘TeamT5’-এর প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণামূলক প্রতিবেদনে এই ভয়ঙ্কর তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ওই সংস্থার গবেষকদের স্পষ্ট দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন আধুনিক টুল এবং চ্যাটবট বর্তমানে অপরাধীদের প্রধান এবং সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। হ্যাকিংয়ের যে সমস্ত অত্যন্ত জটিল পদ্ধতি অতীতে সম্পন্ন করতে হ্যাকারদের দীর্ঘ সময় ও বিপুল পরিশ্রমের প্রয়োজন হতো, বর্তমান যুগের এই উন্নত এআই চ্যাটবটগুলির সৌজন্যে সেই কাজগুলি এখন চোখের পলকে অত্যন্ত সহজ হয়ে গিয়েছে। এর ফলে ক্ষতিকর সাইবার অপরাধীরা অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য বা সংস্থায় অত্যন্ত নিখুঁত ও ধ্বংসাত্মক হামলা চালাতে সক্ষম হচ্ছে।

রিপোর্টে আরও এক ধাপ এগিয়ে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর এবং বিস্ফোরক অভিযোগ তোলা হয়েছে। সেখানে জানানো হয়েছে, চিনের সরকারি অনুদান ও মদতপুষ্ট বিভিন্ন হ্যাকার গ্রুপ অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বিশেষ ধরনের ক্ষতিকর সফটওয়্যার বা ম্যালওয়্যার তৈরি করছে। পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশের সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান, সরকারি দফতর ও কর্পোরেট সংস্থার কম্পিউটার নেটওয়ার্কে অত্যন্ত সুকৌশলে সেই সফটওয়্যার ইনস্টল করে দেদার গোপন তথ্য ও সাইবার সিকিউরিটি ডেটা চুরি করা হচ্ছে। অবশ্য ওই রিপোর্টে এও স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এই ধরনের অবৈধ ও ধ্বংসাত্মক সাইবার অপরাধের জন্য শুধুমাত্র ‘ডিপসিক’ এআই মডেলটিকেই যে এককভাবে দায়ী করা হচ্ছে, বিষয়টি এমন নয়। তবে বিশ্বজুড়ে চলমান সাইবার অপরাধের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হ্যাকাররা এই নির্দিষ্ট মডেলটিকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ব্যবহার করছে, যা আগামী দিনে বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য এক মারাত্মক দুঃসংবাদ বলে অভিহিত করা হয়েছে।

ওপেন সোর্স এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের কাজের সুবিধা বা খরচ হ্রাসের পাশাপাশি অপরাধীদেরও রমরমা বহুলাংশে বেড়ে গিয়েছে। সাধারণত যেকোনো বড়সড় সাইবার হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার জন্য হ্যাকারদের অত্যন্ত জটিল কোডিং লেখা কিংবা বিপুল পরিমাণ ডেটা অ্যাকসেস করার প্রয়োজন হয়। অতীতে এই সমস্ত ডেটা এবং কোডিং বিভিন্ন বৈধ প্ল্যাটফর্ম থেকে চড়া মূল্যে কিনে নিতে হতো হ্যাকারদের। কিন্তু বর্তমানের এই ফ্রি এবং ওপেন সোর্স এআই মডেলগুলির সুবাদে সাইবার অপরাধীদের সেই মোটা অঙ্কের আর্থিক খরচ অনেকটাই বেঁচে যাচ্ছে, যা তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে আরও বেশি করে উসকে দিচ্ছে।

এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও উদ্বেগের বিষয় সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে তাইওয়ানের শীর্ষস্থানীয় সাইবার গবেষণা সংস্থা ‘TeamT5’-এর চিফ অ্যানালিস্ট চার্লিস লি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, “চিনা হ্যাকারদের কাছে ডিপসিক (Deepseek) বর্তমানে অত্যন্ত পছন্দের একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। কারণ এই এআই মডেলটি যেমন একদিকে ভীষণ শক্তিশালী, তেমনই অন্যদিকে এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কম সাইবার গাইডলাইন বা বিধিনিষেধ মেনে চলতে হয়।” নিজের যুক্তির সপক্ষে ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি আরও বলেন যে, পশ্চিমা দেশগুলিতে একাধিক অত্যন্ত ক্ষমতাশালী এআই টুল তৈরি হলেও সেগুলিতে অত্যন্ত কড়া সাইবার গাইডলাইন ও নিরাপত্তা নীতি কঠোরভাবে মেনে চলতে হয়। ফলে সাইবার হামলাকারীরা সচেতনভাবেই ওই পশ্চিমা টুলগুলি এড়িয়ে চলে, কারণ ওই কড়া নিয়মকানুন বা গার্ডরেলগুলি বাইপাস করার জন্য হ্যাকারদের অতিরিক্ত সময় ও মেহনত ব্যয় করতে হয়। সব মিলিয়ে, এই নতুন সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে নতুন সুরক্ষার পথ খোঁজার তাগিদ এখন তীব্র হচ্ছে।