কোটি টাকার প্ল্যান্টে ‘কাঁচামাল নেই’! কলকাতায় নির্মাণ বর্জ্য কোথায় যাচ্ছে? মেয়র ফিরহাদ হাকিমের গুরুতর অভিযোগে ফাঁস হল বড় জালিয়াতি

দেশের অন্যান্য শহরের তুলনায় দূষণের নিরিখে কলকাতার স্থান বরাবরই উপরের দিকে। বিশেষত শীতকালে এই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। এই দূষণে লাগাম টানতে নির্মাণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিপুল বিনিয়োগ করে কলকাতা পুরনিগম (KMC)। রাজারহাটের পাথরঘাটায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে তৈরি করা হয় অত্যাধুনিক কংক্রিট অ্যান্ড ডেমোলিশন (C&D) ওয়েস্ট প্রক্রিয়াকরণ প্ল্যান্ট। কিন্তু কার্যক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কাঁচামাল বা নির্মাণ বর্জ্যের অভাবে এই প্ল্যান্টটি এখন ধুঁকছে।

যা নিয়ে এক গুরুতর অভিযোগ করেছেন কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম। তাঁর অভিযোগ, নির্মাণ বর্জ্য C&D প্ল্যান্টে না ফেলে তা দিয়ে কলকাতা ও তার আশপাশে দেদার পুকুর, জলাভূমি ও নিচু জমি ভরাট করা হচ্ছে। এর ফলস্বরূপ, শহরের বাতাসে PM 10 এবং PM 2.5 মাত্রার ধূলিকণা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

প্ল্যান্টের কার্যক্ষমতা ও চুক্তি
কলকাতা কর্পোরেশন সূত্রে জানা গিয়েছে, হায়দরাবাদের একটি সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করে এই প্ল্যান্টটি তৈরি করা হয়েছে। প্রতিদিন ৫০০ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ করার ক্ষমতা রয়েছে এই প্ল্যান্টের, যেখানে প্রতি টন প্রক্রিয়াকরণের বিনিময়ে সংস্থাটি পাবে ৩৯৬ টাকা। এই চুক্তি ১০ বছরের জন্য করা হয়েছে।

এই প্ল্যান্টে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে নির্মাণ বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ করে তা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা হয়। এটি দেশের ১০টি বড় শহরে ব্যবহৃত হওয়া আধুনিক ব্যবস্থাপনাগুলির মধ্যে অন্যতম। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে কলকাতা এই ব্যবস্থাপনায় মুখ থুবড়ে পড়ছে।

মেয়রের অভিযোগ: বর্জ্য যাচ্ছে জলাভূমিতে
কলকাতা পুরনিগমের একাংশের মতে, কলকাতায় যে পরিমাণ নির্মাণ কাজ চলে, তাতে এই ৫০০ টন কংক্রিট বর্জ্য না-পাওয়ার কোনো কারণ নেই। কিন্তু তার ধারেকাছেও বর্জ্য পাওয়া যাচ্ছে না।

মেয়র ফিরহাদ হাকিম বলেন, “নির্মাণ সাইটের কংক্রিটের বর্জ্য C&D-তে দেওয়ার বদলে লরিতে করে কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে কিংবা লাগোয়া জেলাগুলিতে পুকুর, জলাশয় ও নিচু জমি ভরাট করা হচ্ছে।” তিনি অভিযোগ করেন, ভোর বেলা পুরনো গাড়িগুলি এসে চুপচাপ নির্মাণ বর্জ্য নিয়ে গিয়ে কোথাও না-কোথাও ফেলে দিচ্ছে। ফলস্বরূপ, C&D প্ল্যান্ট ফাঁকা পড়ে থাকছে, আর সেই সব বর্জ্য দিয়ে জলা ভরাট হচ্ছে।

নজরদারি বাড়ানো সত্ত্বেও বেহাল দশা
পুরনিগম নির্মাণ শিল্পের বর্জ্য তোলার জন্য একাধিক ডাম্পার রেখেছে। নির্মাণ স্থল থেকে সরাসরি বর্জ্য তুলে তা পাথরঘাটার প্ল্যান্টে ফেলার কথা। কিন্তু তারপরও প্ল্যান্টের এই বেহাল দশা কেন? উঠছে কর্মীদের গাফিলতি বা ইচ্ছাকৃতভাবে নজর এড়িয়ে যাওয়ার প্রশ্ন।

যদিও মেয়র এই পরিস্থিতির দায়ভার ভারপ্রাপ্ত কর্মী বা আধিকারিকের বদলে নাগরিকদের উপর চাপিয়েছেন। তিনি বলেন, “কলকাতা ও আশপাশে জলা বাঁচানোর দায়িত্ব আমাদের। নির্মাণের বর্জ্য পুকুর, জলাশয় ও নিচু জমিতে না-ফেলে, আমাদের দিয়ে দিন। প্রতি বরোতে গাড়ি আছে, সেগুলো তোলার জন্য।”

তিনি কাউন্সিলরদের সচেতন হতে বলেছেন এবং জঞ্জাল সাফাই বিভাগের এডি-কে দিয়ে নজরদারি করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে, তাঁর মতে, “পরিবেশ সম্পর্কে আমাদের আরও বেশি সচেতন হতে হবে। ইঞ্চিতে-ইঞ্চিতে পুলিশ বা কর্পোরেশনের কর্মী দেওয়া সম্ভব নয়।”