নেপাল নাকি চিন—ভয়াবহ বন্যার আসল খলনায়ক কে? প্রলয়ের নেপথ্যে লুকিয়ে কোন বিস্ফোরক তথ্য?

ভোটকোশি নদীর আকস্মিক এবং বিধ্বংসী বন্যায় কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে নেপাল। সরকারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে প্রায় ১৫ বিলিয়ন রুপির পরিকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। বন্যায় দু’শোরও বেশি মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি হাজারেরও বেশি মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। আর এই মহাপ্রলয়কে কেন্দ্র করে বর্তমানে কাঠমান্ডু থেকে বেইজিং—তীব্র রাজনৈতিক কোন্দল ও অভিযোগে উত্তাল আন্তর্জাতিকমহল।

কার ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছে নেপাল ও চিন?

ভোটকোশির এই আকস্মিক বন্যার জন্য সরাসরি চিনকে কাঠগড়ায় তুলেছে নেপাল। কাঠমান্ডুর অভিযোগ, সময়মতো বন্যার আগাম তথ্য বা সতর্কতা লুকিয়ে রেখেছে বেইজিং। প্রায় ৪৫ মিনিট দেরিতে তথ্য দেওয়ায় সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার সুযোগটুকুও পায়নি। নেপালের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দাহাল প্রচণ্ড এই ঘটনার পর তথ্য আদান-প্রদানের আরও উন্নত ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন। এমনকি ভারত, চিন ও নেপালের মধ্যে আবহাওয়া এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস আদান-প্রদানের জন্য একটি স্থায়ী চ্যানেল তৈরিরও সওয়াল করেছে নেপালের সমস্ত রাজনৈতিক দল।

অন্যদিকে, সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে চিনের পালটা দাবি, এই বিপর্যয়ে তারাও সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং চিনেরও আড়াইশোর বেশি নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।

বন্যার নেপথ্য কারণ নিয়ে যে ৩টি তত্ত্ব ঘুরছে

বিজ্ঞান ও কূটনৈতিক মহলে এই ভয়াবহ বন্যার মূল কারণ নিয়ে মূলত তিনটি জোরালো তত্ত্ব উঠে এসেছে:

  1. হিমবাহ ভাঙার তত্ত্ব: তিব্বতের গিয়োরিংয়ের কাছে প্রবল ভূমিধসের জেরে হিমবাহ ভেঙে এই সর্বনাশা জলোচ্ছ্বাস তৈরি হয়।

  2. ভূমিকম্প ও বাঁধ ভাঙার তত্ত্ব: তিব্বতের কোনো অংশে হওয়া তীব্র ভূমিকম্পের জেরে ভূমিধস হয় এবং তার ফলে নদীসংলগ্ন একটি হ্রদের বাঁধ ভেঙে জল হুড়মুড়িয়ে নেমে আসে।

  3. নদীর গতিপথ পরিবর্তনের তত্ত্ব: নেপালে প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্পের পর ভূমিধস হয়ে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়ে যায়, যার জেরে ভোটকোশিতে আচমকা এই ভয়ঙ্কর প্লাবন দেখা দেয়।

বিপজ্জনক হ্রদ ও তথ্যের লুকোচুরি

আন্তর্জাতিক সংস্থা ICIMOD এবং UNDP-এর একটি সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, নেপাল-চীন সীমান্ত অঞ্চলে প্রায় ৩,৬২৪টি হিমবাহ হ্রদ রয়েছে, যার মধ্যে ৪৭টিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং ৮টিকে আক্ষরিক অর্থেই ‘বোমা’ বা বিস্ফোরক হ্রদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে যে হ্রদটি ফেটে এই বিপত্তি ডেকে এনেছিল, তা চিনের ভূখণ্ডের অন্তর্গত ছিল বলে দাবি। কিন্তু চিনের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে কোনো স্পষ্ট বা আনুষ্ঠানিক তথ্য না দেওয়ায় ধোঁয়াশা আরও বেড়েছে। একদিকে কাঠমান্ডু ও বেইজিংয়ের পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতি, অন্যদিকে হিমালয়ের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা চরম অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে ভোটকোশির বন্যা এক গভীর ভূরাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে।