কেঁপে উঠল ধরিত্রী, সরে গেল আস্ত মাটি! ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের এমন ছবি দেখেনি বিশ্ব, অবাক নাসাও

জুন মাসে ভেনেজুয়েলায় পরপর সংঘটিত দু’টি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকম্প শুধু হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি এবং অবকাঠামো ধ্বংসই করেনি, বরং পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠের ভৌগোলিক অবস্থানেও এনেছে অভাবনীয় পরিবর্তন। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা NASA এবং ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ISRO-র যৌথ উচ্চাভিলাষী মিশন NISAR (NASA-ISRO Synthetic Aperture Radar) এই বিধ্বংসী বিপর্যয়ের এমন কিছু অভূতপূর্ব ছবি ও তথ্য জনসমক্ষে এনেছে, যা দেখে বিশ্বজুড়ে ভূতত্ত্ববিজ্ঞানীরাও রীতিমতো বিস্মিত। সদ্য সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, এই জোড়া ভূমিকম্পের ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মাটি প্রায় ৬০ সেন্টিমিটার অর্থাৎ প্রায় দুই ফুট পর্যন্ত তার নিজ স্থান থেকে সরে গিয়েছে। বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর প্রথমবারের মতো NISAR তাদের অত্যাধুনিক ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স অবজারভেশন সিস্টেম’ ব্যবহার করে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ রাডার তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৪ জুন, যখন উত্তর ভেনেজুয়েলার জনবহুল ভূখণ্ডে প্রথমে ৭.২ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭.৫ মাত্রার দ্বিতীয় আরেকটি বিধ্বংসী ভূমিকম্প গোটা অঞ্চলকে কাঁপিয়ে তোলে। এই জোড়া প্রলয়ে গোটা ভেনেজুয়েলায় নজিরবিহীন ধ্বংসলীলা সৃষ্টি হয় এবং জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। কীভাবে এই মাটির সরে যাওয়ার ঘটনা বিশেষজ্ঞদের নজরে এল, তার ব্যাখ্যাও মিলেছে। এটি ছিল NISAR মিশনের প্রথম কোনো বড় দুর্যোগ-পরবর্তী জরুরি পর্যবেক্ষণ অভিযান। দুর্যোগের পরপরই উপগ্রহটি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের উচ্চ-রেজোলিউশন রাডার চিত্র সংগ্রহ শুরু করে। বিজ্ঞানীরা ভূমিকম্পের আগের ও পরের রাডার চিত্রগুলির মধ্যে নিখুঁত তুলনা করে নির্ধারণ করেন যে কোথায় এবং ঠিক কতটা ভৌগোলিক পরিবর্তন ঘটেছে। এই বিশেষ কাজের জন্য ব্যবহার করা হয় ‘ইনসার’ (InSAR বা Inter-ferometric Synthetic Aperture Radar) প্রযুক্তি, যা ভূ-পৃষ্ঠের মিলিমিটার স্তরের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরিবর্তনও নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম। বিভিন্ন সময়ে মহাকাশ থেকে তোলা রাডার চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, একাধিক এলাকায় মাটি তার পূর্বের নির্ধারিত অবস্থান থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে দূরে সরে গিয়েছে।
বিজ্ঞানীদের সুনির্দিষ্ট মতে, এই ভয়াবহ ভূমিকম্পগুলির প্রধান কারণ ছিল ‘স্ট্রাইক-স্লিপ ফল্ট’ (Strike-Slip Fault)। এই বিশেষ প্রকৃতির ভূমিকম্পে দুটি বিশাল টেকটোনিক প্লেট একে অপরের উপর বা নিচে না সরে গিয়ে বরং পাশাপাশি বিপরীতমুখী দিশায় ঘষে সরে যায়। ভেনেজুয়েলার এই ঘটনায় ক্যারিবিয়ান টেকটোনিক প্লেট এবং দক্ষিণ আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটের ঠিক এই ধরনেরই পার্শ্বীয় সঞ্চালন ঘটেছিল। সবচেয়ে বেশি ভূমি সরে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ধরা পড়েছে রাজধানী কারাকাসের উত্তরে অবস্থিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকায়, যেখানে মাটির স্থানচ্যুতি ঘটেছে প্রায় ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত।
NISAR-এর মহাকাশ থেকে সংগৃহীত এই অমূল্য তথ্য এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা USGS-সহ বিশ্বের তাবড় ভূতাত্ত্বিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ডেটা হয়ে উঠেছে। এই তথ্য গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা খুব সহজেই বুঝতে পারবেন যে কোন নির্দিষ্ট ফল্ট লাইনে ঠিক কতটা ভূতাত্ত্বিক চাপ বা স্ট্রেস এখনও অবরুদ্ধ হয়ে জমে রয়েছে এবং ভবিষ্যতে কোন নির্দিষ্ট এলাকায় আফটারশক বা নতুন ভূমিকম্পের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি হতে পারে। নিঃসন্দেহে এই আধুনিক তথ্য ভবিষ্যতের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, পরিকল্পনা এবং উন্নত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে আরও অনেক বেশি কার্যকর করে তুলতে সাহায্য করবে।