কারও কথা শুনবে না Samsung-ও! মার্কিন ‘Foreign Direct Product Rule’ নকল করে বিশ্ব অর্থনীতিতে রাশ টানছে বেজিং!

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) হোয়াইট হাউসে ফেরার পর চলতি বছর বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করলেই, বিশ্ব অর্থনীতির দুই বৃহৎ শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিন (US and China) একে অপরের বিরুদ্ধে পালটা ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। এই সংঘাতে এবার চিন এমন একটি কৌশল নিয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকা ব্যবহার করে আসছে।

বেজিং প্রথমবারের মতো তাদের ‘রেয়ার আর্থ’ (Rare Earth) রপ্তানি বিধিনিষেধ বাড়িয়ে ঘোষণা করেছে যে, বিদেশী কোম্পানিগুলিকেও এখন থেকে তাদের ম্যাগনেট রপ্তানির জন্য চিনা সরকারের অনুমোদন নিতে হবে—এমনকি সেই ম্যাগনেটে যদি সামান্যতম চিনা রেয়ার আর্থ উপাদানও থাকে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে চিনের নিয়ন্ত্রণ
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিশন গ্রীর (Jamieson Greer) বলেন, এর অর্থ হলো, যদি কোনো দক্ষিণ কোরিয়ার স্মার্টফোন নির্মাতা তাদের ডিভাইসে চিনা রেয়ার আর্থ উপাদান ব্যবহার করে অস্ট্রেলিয়ায় বিক্রি করতে চায়, তবে তাদের বেজিংয়ের অনুমতি নিতে হবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, “এই নিয়মটি প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলে কার্যত পুরো বিশ্ব অর্থনীতির উপর চিনকে নিয়ন্ত্রণ এনে দেয়।”

চিনের এই পদক্ষেপটি দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতি—’ফরেন ডাইরেক্ট প্রোডাক্ট রুল (Foreign Direct Product Rule)’-এর হুবহু অনুকরণ। এই মার্কিন নীতিটি বিদেশী-তৈরি পণ্যের উপর মার্কিন আইনের ক্ষমতাকে প্রসারিত করে এবং এটি নিয়মিতভাবে চিনের নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগুলিতে প্রবেশাধিকার সীমাবদ্ধ করতে ব্যবহৃত হয়েছে।

চিনা রাজনীতি বিশেষজ্ঞ নিল থমাস (Neil Thomas) বলেন, “চিন সেরাদের কাছ থেকে শিখছে। বেজিং ওয়াশিংটনের কৌশল নকল করছে, কারণ তারা সরাসরি দেখেছে মার্কিন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কীভাবে তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধা দিতে পারে।”

ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের পরই চিনের ‘নতুন অস্ত্রাগার’
২০১৮ সালে ট্রাম্প চিনকে লক্ষ্য করে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করার পরেই বেজিং দ্রুত একগুচ্ছ নতুন আইন ও নীতি তৈরি করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, যা ভবিষ্যতে বাণিজ্য সংঘাতের সময় ব্যবহার করা যেতে পারে। তারা ধারণার জন্য ওয়াশিংটনের দিকেই তাকিয়েছিল।

‘আনরিলায়াবল এনটিটি লিস্ট’ (Unreliable Entity List): ২০২০ সালে চিনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই তালিকা তৈরি করে, যা মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের ‘এনটিটি লিস্ট’-এর মতো। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট বিদেশী কোম্পানিকে চিনের সঙ্গে ব্যবসা করা থেকে বিরত রাখা হয়।

অ্যান্টি-ফরেন স্যাংশন আইন (Anti-foreign sanction law): ২০২১ সালে চিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অপ্রীতিকর ব্যক্তি ও ব্যবসার ভিসা বাতিল এবং সম্পদ জব্দ করার ক্ষমতা পায়, যা মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও ট্রেজারি বিভাগের ক্ষমতার অনুরূপ।

চিন সরকারের রাষ্ট্র-পরিচালিত সংবাদ সংস্থা চায়না নিউজ এটিকে বিদেশী নিষেধাজ্ঞা, হস্তক্ষেপ এবং ‘লং-আর্ম জুরিসডিকশন’-এর বিরুদ্ধে একটি ‘টুলকিট’ বলে আখ্যায়িত করে এবং জানায়, বেজিং “শত্রুর পদ্ধতিতেই পালটা আঘাত” করছে।

চলতি বছরের ঘটনাপ্রবাহ
চলতি বছর ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফেরার পর শুল্ক আরোপ শুরু করলে চিন দ্রুত তার নতুন অস্ত্রগুলি ব্যবহার করা শুরু করে:

ফেব্রুয়ারি: ফেন্টানিল তৈরির রাসায়নিক প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগে ট্রাম্পের প্রথম ১০ শতাংশ শুল্কের জবাবে, চিনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় PVH Group (যার অধীনে Calvin Klein এবং Tommy Hilfiger রয়েছে) এবং বায়োটেকনোলজি কোম্পানি Illumina-কে ‘আনরিলায়াবল এনটিটি লিস্ট’-এ অন্তর্ভুক্ত করে। পাশাপাশি চিন টাংস্টেন, টেলুরিয়াম, বিসমুথ, মলিবডেনাম এবং ইন্ডিয়ামের উপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে।

মার্চ: ট্রাম্প দ্বিতীয় ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করলে, চিন আরও ১০টি মার্কিন সংস্থাকে আনরিলায়াবল এনটিটি লিস্টে এবং ১৫টি মার্কিন সংস্থাকে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ তালিকায় যুক্ত করে। এর মধ্যে General Dynamics Land Systems এবং General Atomics Aeronautical Systems-এর মতো মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলিও ছিল।

এপ্রিল (‘লিবারেশন ডে’ ট্যারিফ): বেজিং ট্রাম্পের আরোপ করা ১২৫ শতাংশের মতো উচ্চ শুল্কের পালটা দেয়। সেই সঙ্গে আরও বেশি মার্কিন সংস্থাকে কালো তালিকাভুক্ত করে এবং অতিরিক্ত রেয়ার আর্থ মিনারেলসের উপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ঘোষণা করে। এর ফলে স্মার্টফোন, ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল, জেট প্লেন এবং মিসাইলের মতো বিভিন্ন পণ্য তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ম্যাগনেটের চালান সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পালটা আক্রমণের কৌশল ঝুঁকিমুক্ত নয়। ইয়েল ল স্কুলের সিনিয়র রিসার্চ স্কলার জেরেমি ডাউম (Jeremy Daum) বলেন, “এ ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায্য পদ্ধতির বিপদ হলো, এক পক্ষ যাকে পারস্পরিকতা হিসেবে দেখবে, অন্য পক্ষ তাকে ‘উত্তেজনা বৃদ্ধি’ (escalation) হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে। আর দ্বিতীয়ত, এই ‘নীচের দিকে রেসে’ কেউই জেতে না।”