কলেজ স্ট্রিটে লালবাজারের লাল চোখ! নিট কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে কলকাতায় মিছিল করতে গিয়েও পিছু হটল সিজেপি

সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা তথা নিট (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং প্রশাসনিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান দেশজোড়া প্রতিবাদের আঁচ এবার এসে পড়েছে খাস কলকাতার বুকে। একদিকে যখন দীর্ঘ ২৬ দিনের দীর্ঘ ও কঠিন অনশন সফলভাবে সমাপ্ত করে মধ্যরাতে মেদান্ত হাসপাতাল থেকে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা করেছেন বিশিষ্ট পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক, ঠিক তখনই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি রাজধানী ও মহানগরেও প্রতিবাদের রূপ বদলাতে শুরু করেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো স্পর্শকাতর ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচারের স্বার্থে বিশেষ ‘ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত’ গঠনের যুগান্তকারী ঘোষণা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি অপরাধীদের চিহ্নিত করতে একাধিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, নিজেদের প্রাথমিক ও অনড় দাবিতে এখনও সম্পূর্ণভাবে অনড় রয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে তারা আন্দোলন আরও তীব্র করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এই আবহে এবার বৃহত্তর ছাত্র আন্দোলনকে কলকাতার অলিগলিতে এবং রাজপথে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিল সিজেপি। সেই লক্ষ্যেই আজ শুক্রবার কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কলেজ স্ট্রিট থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত একটি সুশৃঙ্খল বিশাল মিছিল করার সুনির্দিষ্ট অনুমতি চেয়ে লালবাজারের যুগ্ম পুলিশ কমিশনারের (Joint CP) দপ্তরে লিখিত আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে এই বিক্ষোভ মিছিলের কোনো রকম আইনি অনুমতি প্রদান করা হয়নি। ফলস্বরূপ, প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের মুখে পড়ে বাধ্য হয়ে নিজেদের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে সিজেপি নেতৃত্ব।

পুলিশি অনুমতি না পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঝরাতে ময়দানে নামে সিজেপি। ককরোচ জনতা পার্টির কলকাতার অন্যতম সক্রিয় সদস্য ও মুখ পাত্র দেদীপ্য গঙ্গোপাধ্যায় গভীর রাতে একটি জরুরি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন। সেই ভিডিও বার্তায় তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, প্রশাসনের সঙ্গে দলের কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি বা যোগাযোগ সংক্রান্ত সমস্যা তৈরি হয়েছিল। সেই ভুল বার্তা বা বিভ্রান্তি যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে না ছড়ায়, সেই উদ্দেশ্যেই তিনি মাঝরাতে এই স্পষ্টীকরণ ভিডিওটি রেকর্ড করছেন। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সুরেই জানান যে, তাঁদের পূর্বনির্ধারিত কলেজ স্ট্রিট থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত ঐতিহাসিক মিছিলটি পুলিশের অনুমতি না পাওয়ার কারণে তাঁরা সম্পূর্ণভাবে কল অফ করতে বা বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে এই আকস্মিক পদক্ষেপেও আন্দোলন থেমে থাকছে না জানিয়ে তিনি বলেন যে, আজ শিয়ালদহ থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মিছিল সংঘটিত হতে চলেছে। দলের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ ও সামাজিক মাধ্যমের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম থেকে স্পষ্ট নির্দেশিকা দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, যে সমস্ত সাধারণ মানুষ ও সমর্থক এই প্রতিবাদ মিছিলে যোগ দিতে ইচ্ছুক, তাঁরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাতে অংশ নিতে পারেন। তবে এই মিছিলগুলিতে সিজেপি, কলকাতার কোনো নির্দিষ্ট দলীয় ব্যানার বা প্রতীক ব্যবহার করা হবে না।

রাজনৈতিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, এদিন বামপন্থী ছাত্র সংগঠন এবং সাধারণ ছাত্র সমাজের যৌথ উদ্যোগে শিয়ালদহ থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত একটি বিশাল মহামিছিলের ডাক দেওয়া হয়েছে। আজ দুপুর আড়াইটে থেকে এই মেগা মিছিল শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এই কর্মসূচিতে ‘স্টুডেন্টস অফ বেঙ্গল’ নামের অপর একটি সক্রিয় ছাত্র সংগঠনেরও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সামিল হওয়ার কথা রয়েছে। মূলত এই সংগঠনের পূর্বনির্ধারিত মিছিলকেই বাইরে থেকে সমর্থন জানানোর কৌশল নিয়েছে সিজেপি। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে যে, তাঁরা কলেজ স্কোয়ার থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত নিজস্ব কোনো স্বতন্ত্র ও পৃথক মিছিল আর পরিচালনা করছেন না, বরং বাম ছাত্র সংগঠনগুলির সঙ্গে এক মঞ্চে বা যৌথ ধারায় পরোক্ষভাবে নিজেদের প্রতিবাদ বজায় রাখছে। সমান্তরালভাবে, বাম ছাত্র সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে আজ শহরজুড়ে ‘রাত জাগো, দেশ জাগো’ শীর্ষক একটি জোরালো প্রতিবাদী কর্মসূচিও গ্রহণ করা হয়েছে। আটটি বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের যৌথ ডাকে এই মহামিছিলকে ঘিরে কলকাতার নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত কঠোর করা হয়েছে। অন্যদিকে, নিট প্রশ্নফাঁস ও প্রশাসনিক অব্যবস্থার জেরে সৃষ্ট এই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে অত্যন্ত কড়া বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ এবং ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠনের যুগান্তকারী সিদ্ধান্তকে আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানিয়েছেন। একইসঙ্গে স্বচ্ছতা ফেরাতে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রক ইতিমধ্যেই তাদের সচিবকে অপসারিত করেছে। সোনম ওয়াংচুক মধ্যরাতে নিজের অনশন আন্দোলন স্থগিত করলেও, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর চূড়ান্ত ইস্তফা না আসা পর্যন্ত এই আন্দোলন দেশজুড়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাওয়ার হুংকার দিয়েছে সিজেপি।