কলকাতার নামী স্কুলে বড় বিপত্তি! মিড-ডে মিলের খাবার খেতেই একসঙ্গে অসুস্থ ২৪ জন ছাত্রী, হাহাকার অভিভাবকদের!

সোমবার কলকাতার দেশবন্ধু পার্ক এলাকার একটি নামী স্কুলে ঘটে গেল এক কার্যত নজিরবিহীন ও মর্মান্তিক ঘটনা। স্কুলের মিড-ডে মিলের খাবার এবং পানীয় জল খাওয়ার পরেই হঠাৎ করে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ২৪ জন ছাত্রী। জ্বর, প্রচণ্ড পেটে ব্যথা, লাগাতার বমি এবং তীব্র শ্বাসকষ্টের মতো একাধিক জটিল উপসর্গ নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ওই ছাত্রীদের কলকাতার ঐতিহ্যবাহী আরজি কর হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে ভর্তি করা হয়। ছোট্ট মেয়েগুলির এমন আকস্মিক ও শোচনীয় শারীরিক অবনতির খবর ছড়িয়ে পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে স্কুল চত্বর ও হাসপাতাল চত্বরে চরম উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা এবং হাহাকার শুরু হয়ে যায়।
অসুস্থ পড়ুয়াদের অভিভাবকদের সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার দিন স্কুল চত্বরে ছাত্রীরা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও সুস্থ ছিল। এমনকি ঘটনার কিছুক্ষণ আগেই বাবা-মায়ের সঙ্গে তাদের ফোনে কথাও হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই গভীর রাতে স্কুল কর্তৃপক্ষ থেকে ফোন করে অভিভাবকদের জানানো হয় যে তাদের সন্তানের হঠাৎ শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে এবং দ্রুত তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর আতঙ্কিত অভিভাবকরা জানান যে তাদের মেয়েদের তীব্র শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল, বুক ফেটে যাওয়ার মতো যন্ত্রণা হচ্ছিল, মাথা ঘুরে তারা মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিল এবং চোখে মুখে গুরুতর অসুস্থতার ছাপ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
ঘটনার তীব্রতা উপলব্ধি করে সোমবার রাতেই তড়িঘড়ি আরজি কর হাসপাতালে ছুটে যান রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। তিনি সরাসরি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে চিকিৎসাধীন ছাত্রীদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন এবং ভেঙে পড়া অভিভাবক ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলে তাঁদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি, হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের জরুরি বৈঠকে বসে সমগ্র পরিস্থিতির বিস্তারিত পর্যালোচনা করেন তিনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যে এই ঘটনার পেছনে ঠিক কী কারণ রয়েছে—তা জলবাহিত বিষক্রিয়া নাকি খাদ্যে বিষক্রিয়া—তা দ্রুত খুঁজে বের করতে হবে।
প্রাথমিক তদন্তের পর চিকিৎসকদের জোরালো অনুমান, স্কুলের খাবার বা পানীয় জলে ক্ষতিকারক কোনও উপাদানের কারণে বিষক্রিয়া (Food Poisoning) ছড়িয়ে থাকতে পারে। তবে আপাতত চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে ও চিকিৎসায় ছাত্রীদের শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে অনেকটাই উন্নতির দিকে রয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়েছে। এই আকস্মিক সংকটের মোকাবিলায় মঙ্গলবারই রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের এক বিশেষ প্রতিনিধি দল সরাসরি সংশ্লিষ্ট স্কুল পরিদর্শনে যাওয়ার কথা রয়েছে। স্কুলের পানীয় জলের বড় ট্যাঙ্কগুলি সম্পূর্ণ পরিষ্কার রয়েছে কি না, জলের মান যাচাই করতে ল্যাবরেটরিতে স্যাম্পেল পাঠানো হবে এবং রান্নায় ব্যবহৃত সমস্ত কাঁচামাল খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা হবে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে স্থানীয় উল্টোডাঙা থানার পুলিশ ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট স্কুলের রান্নাঘরটি সিল করে দিয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানিয়েছেন, “স্বাস্থ্য দফতর থেকে অবিলম্বে ওই স্কুলে একটি প্রতিনিধি দল পাঠানো হবে। কোথায় কীভাবে খাবার তৈরি হয়, রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা কেমন রয়েছে এবং যারা রান্না করেন তাঁদের স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা—সবটাই খতিয়ে দেখা হবে। জলের গুণগত মানও পরীক্ষা করা হচ্ছে। নিয়মমাফিক উল্টোডাঙা থানা থেকে গিয়ে ইতিমধ্যেই রান্নাঘর সিল করে দিয়েছে। আমি থানার আইসি-কে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছি যাতে দ্রুত বিকল্প রান্নার একটি নিরাপদ ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়, যাতে অন্য কোনও সমস্যা না হয়।” সব মিলিয়ে, এই ঘটনায় স্কুল চত্বরে চরম শোরগোল পড়ে গিয়েছে।