কলকাতায় ইডির মেগা রেড! ২৯০ কোটির ব্যাংক জালিয়াতি কাণ্ডে নাম জড়াল কোন প্রভাবশালী শিল্পপতির?

ভারতের আর্থিক তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে এক নজিরবিহীন আর্থিক কেলেঙ্কারির চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এনেছে। প্রায় ২৯০ কোটি টাকার একটি বিশাল ব্যাংক জালিয়াতির মামলার মূল রহস্য উন্মোচন করতে ইডি-র কলকাতা জোন-১-এর বিশেষ টিম কলকাতার মোট ১১টি ভিন্ন স্থানে একযোগে তল্লাশি অভিযান শুরু করেছে। এই চাঞ্চল্যকর মামলাটি মূলত মেসার্স কোহিনূর পাওয়ার প্রাইভেট লিমিটেড নামক একটি কর্পোরেট সংস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে, যারা ঝাড়খণ্ডে একটি ৬৬-মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মহৎ উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বা বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু প্রাথমিক তদন্তে অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ উঠেছে যে, ঋণ হিসেবে প্রাপ্ত এই বিপুল পরিমাণ অর্থ নির্দিষ্ট বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে অন্য গ্রুপ সংস্থাগুলিতে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং ব্যক্তিগত কাজে তা তছরুপ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে কোম্পানিটি দেউলিয়া ঘোষণার জন্য এনসিএলটি (NCLT)-র দ্বারস্থ হয়। কিন্তু আইনি অবসায়ন বা লিকুইডেশন প্রক্রিয়ার সময় ব্যাংকগুলি মাত্র প্রায় ৭ কোটি টাকার মতো সামান্য অর্থই পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়, যার ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক এবং অন্যান্য আর্থিক ঋণদাতাদের কোটি কোটি টাকার ব্যাপক আর্থিক লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছে। ইডি-র এই ব্যাপক তল্লাশি অভিযানের পরিধিতে অভিযুক্ত এই কর্পোরেট গ্রুপটির দুই মূল প্রোমোটার প্রশান্ত বোথরা এবং বিজয় বোথরার মালিকানাধীন বিলাসবহুল বাসস্থান ও বাণিজ্যিক প্রাঙ্গণগুলিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন যে কীভাবে সুপরিকল্পিত উপায়ে এত বড় অঙ্কের ব্যাংক ঋণ আত্মসাৎ করা হলো এবং এর নেপথ্যে আর কোন কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি বা চক্রের হাত রয়েছে।
অন্যদিকে, গত ২ সেপ্টেম্বর ন্যাশনাল হাইওয়ে অথরিটি অফ ইন্ডিয়া বা এনএইচএআই (NHAI)-এর একটি বড় ধরনের জালিয়াতি মামলার সূত্র ধরে ইডি পশ্চিমবঙ্গ সহ দেশের মোট সাতটি রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে। এই সুনির্দিষ্ট মামলাটিতে জাল টোল রসিদ তৈরি করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ গাড়িচালকদের কাছ থেকে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায়ের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে যে, কেন্দ্রীয় সশস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর সুরক্ষায় ইডির ছয়জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার একটি বিশেষ দল কলকাতার অভিজাত শেক্সপিয়র সরণি এলাকার একটি নামী ফ্ল্যাটে আকস্মিক অভিযান চালায়, যেখানে শহরের এক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর গোপন কার্যালয় অবস্থিত। ইডি-র অভ্যন্তরীণ সূত্র জানাচ্ছে যে, উত্তর প্রদেশের লখনউতে দায়ের করা একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই সংস্থাটি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ, উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র এবং রাজস্থান রাজ্যের প্রায় ১৪টি স্থানে একই সঙ্গে এই মেগা অভিযান পরিচালনা করছে।
প্রাথমিক তদন্তে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, জাল বা নকল রসিদ ছাপিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সংগৃহীত এই সমস্ত কোটি কোটি টাকা অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে টোল বুথের মূল হিসাব থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। সরকারি সূত্রে আরও জানা গেছে যে, সংশ্লিষ্ট টোল বুথগুলির কোনো দাপ্তরিক বা সরকারি নথিতে এই ধরনের বিপুল অর্থ প্রাপ্তির কিংবা জমার কোনো বৈধ রেকর্ড ছিল না। বর্তমানে ইডি-র তদন্তকারী কর্মকর্তারা এই অবৈধভাবে সংগৃহীত কালো টাকার সঠিক গন্তব্য কোথায় এবং এই প্রতারণা চক্রের মূল হোতারা কারা, তা খুঁজে বের করতে দিনরাত এক করে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন।