শেয়ার বাজারে বড় ধস নামার শঙ্কা! কেন হঠাৎ সরকারি বন্ডের চড়া ইল্ড ঘুম কেড়ে নিয়েছে কোটি কোটি বিনিয়োগকারীর?

ভারতের অর্থনৈতিক পরিকাঠামোয় শেয়ার বাজারের গুরুত্ব আজ অনস্বীকার্য। দেশের প্রায় ১৪৫ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ২১ কোটিরও বেশি মানুষ বর্তমানে সরাসরি ইক্যুইটি মার্কেটে বিনিয়োগ করে আসছেন। অর্থনীতি যেন জাতির শিরায় শিরায় রক্ত সঞ্চালনের মতো এই বাজারের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, দীর্ঘ সময় ধরে চলা অস্থিতিশীলতার কারণে শেয়ার বাজার বিনিয়োগকারীদের কাঙ্ক্ষিত মুনাফা এনে দিতে ব্যর্থ হয়েছে এবং এখনও পর্যন্ত কোনো নতুন রেকর্ড গড়তে পারেনি। এর পেছনে কাজ করছে বিশ্বজুড়ে আর্থিক বাজারের এক জটিল পরিস্থিতি, যা সরাসরি ভারতের মতো উদীয়মান বাজারগুলোকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বর্তমান সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বব্যাপী সরকারি বন্ডের ইল্ডের অস্বাভাবিক ও রেকর্ড বৃদ্ধি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১০-বছর মেয়াদী ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে প্রায় ৪.৮১%-এ দাঁড়িয়েছে, যা ৫%-এর কাছাকাছি পৌঁছালে বিশ্বজুড়ে শেয়ার বাজারে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। শুধু আমেরিকা নয়, জাপানের ১০-বছর মেয়াদী বন্ডের ইল্ড ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩%-এর উপরে উঠেছে এবং অস্ট্রেলিয়ার বন্ড ইল্ড ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫.১৯৮%-এ পৌঁছেছে। এই বৈশ্বিক ঋণ বিক্রির হিড়িকের আঁচ থেকে বাদ পড়েনি ভারতও। সম্প্রতি ১০-বছর মেয়াদী ভারতীয় সরকারি বন্ডের ইল্ড তিন মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো ৭% অতিক্রম করেছে। ব্রিটেন থেকে শুরু করে জার্মানি ও ফ্রান্স—সব প্রধান অর্থনীতিতেই ঋণের খরচ কয়েক দশকের রেকর্ড ভেঙে চূড়ায় অবস্থান করছে।
বন্ডের ইল্ড এভাবে লাগাতার বেড়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে প্রধান অর্থনীতিগুলোর বেহিসাব ঋণ গ্রহণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ঋণ প্রথমবারের মতো আকাশছোঁয়া ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। এর পাশাপাশি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির নজিরবিহীন প্রসার এবং ডেটা সেন্টার তৈরিতে প্রধান প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর দেদার ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বিশ্বব্যাপী কর্পোরেট বন্ডের বাজারকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পাঁচটি এআই হাইপারস্কেলার কোম্পানি এই বছর ইতোমধ্যে ২২০ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড ঋণপত্র জারি করেছে, যার জেরে বিশ্বব্যাপী কর্পোরেট বন্ড ইস্যু ৪.৯ ট্রিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ব্রেন্ট ক্রুড তেলের ক্রমবর্ধমান দাম, যা বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মার্কিন ফেড চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুদের হার আরও কঠোর বা বৃদ্ধি করা হতে পারে, যার ফলে সিএমই ফেডওয়াচ ডেটা অনুযায়ী সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা ৬৬ শতাংশে গিয়ে পৌঁছেছে।
এই বৈশ্বিক পরিস্থিতির সরাসরি কোপ এসে পড়ছে ভারতীয় শেয়ার বাজারের ওপর। প্রথমত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপদ বন্ড যখন বিনিয়োগকারীদের কোনো ঝুঁকি ছাড়াই ৫% পর্যন্ত নিশ্চিত রিটার্ন দিচ্ছে, তখন বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বা এফআইআই (FPI) ভারতের মতো উদীয়মান বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ পুঁজি তুলে নিয়ে মার্কিন ট্রেজারিতে স্থানান্তরিত করছে। দ্বিতীয়ত, বন্ডের উচ্চ ইল্ড ইক্যুইটি মার্কেটের আকর্ষণ মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে এবং কর্পোরেট ঋণের চড়া সুদের কারণে দেশীয় সংস্থাগুলোর নিট মুনাফার মার্জিন সংকুচিত হচ্ছে। তৃতীয়ত, তেলের দাম বাড়ায় আমদানিকৃত মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং টাকার অবমূল্যায়ন ভারতীয় অর্থনীতিকে আরও বেশি বেকায়দায় ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে আর্থিক বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে, বিনিয়োগকারীদের অত্যন্ত দামী এবং অতিরিক্ত ঋণগ্রস্ত স্টকগুলি অবিলম্বে এড়িয়ে চলা উচিত। পরিবর্তে, শক্তিশালী ব্যালেন্স শীট, শূন্য বা ন্যূনতম ঋণ এবং ধারাবাহিক ফ্রি ক্যাশ ফ্লো তৈরির ক্ষমতাসম্পন্ন মৌলিকভাবে শক্তিশালী কোম্পানিগুলিতে মনোযোগ দেওয়াই বর্তমান বৈশ্বিক বাজারে মূলধন সুরক্ষার একমাত্র হাতিয়ার।