টালিগঞ্জের ব্যস্ত মোড়, ট্রামের শব্দ আর মানুষের ভিড়ের মাঝে এক শান্ত মায়াবী আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে করুণাময়ী কালীমন্দির। বাইরে থেকে সাধারণ মনে হলেও, এই মন্দিরের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে আড়াইশো বছরের পুরনো এক করুণ আর রহস্যময় ইতিহাস। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের জমিদার নন্দদুলাল রায়চৌধুরী যখন এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তার নেপথ্যে ছিল এক বাবার বুকফাটা আর্তনাদ।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, নন্দদুলাল রায়চৌধুরীর অত্যন্ত আদরের একমাত্র কন্যা ছিল করুণাময়ী। কিন্তু অকালেই সেই কন্যার মৃত্যু হয়। সন্তানকে হারিয়ে যখন জমিদার পাগলপ্রায়, তখনই এক রাতে তিনি এক অলৌকিক স্বপ্নাদেশ পান। স্বপ্নে তিনি দেখেন একটি বিশেষ কষ্টিপাথর, যেখানে দেবী স্বয়ং বিরাজ করছেন। পরদিন সেই নির্দিষ্ট স্থান থেকে পাথরটি উদ্ধার করা হয় এবং দেবীর বিগ্রহ তৈরি করা হয়। নিজের মৃত কন্যার স্মৃতিকে অমর করে রাখতে জমিদার দেবীর নাম রাখেন ‘করুণাময়ী’।
এই মন্দিরের বিশেষত্ব হলো দেবীর রূপ। অন্যান্য কালীমূর্তির মতো এখানে দেবী রণচণ্ডী বা ভয়ংকর নন, বরং তিনি এখানে শান্ত, মমতাময়ী এবং কন্যা রূপে পূজিতা হন। ভক্তদের বিশ্বাস, মা এখানে কন্যারূপেই আগলে রাখেন সবাইকে। তবে এই ভক্তির পাশাপাশি জড়িয়ে আছে কিছু গায়ে কাঁটা দেওয়া রহস্যও। স্থানীয়দের অনেকের দাবি, গভীর রাতে মন্দির চত্বর থেকে অস্পষ্ট নূপুরের শব্দ ভেসে আসে। কেউ কেউ বলেন, অমাবস্যার রাতে মন্দিরের গহীনে এক অলৌকিক উপস্থিতির অনুভব পাওয়া যায়। আজও সেই পুরনো কষ্টিপাথরের মূর্তির সামনে দাঁড়ালে ভক্তি আর বিষাদের এক অদ্ভুত মিশ্রণ অনুভব করেন দর্শনার্থীরা।