আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির সহায়তায় এক কঠিন লড়াইয়ে জয়ী হলেন কলকাতার চিকিৎসকরা। জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত ৮ এবং ১০ মাস বয়সী দুই শিশুকে টানা ১১০ ঘণ্টা ‘একমো’ (ECMO) সাপোর্টে রেখে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। শহরের এক বেসরকারি হাসপাতালের এই সাফল্যকে চিকিৎসা মহলে ‘মেডিক্যাল মিরাকল’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঠিক কী হয়েছিল শিশুদের? হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ১০ মাস বয়সী র্যাচেল ও ৮ মাস বয়সী সুইটি—উভয় শিশুই জটিল জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত ছিল। র্যাচেলের মাইট্রাল ভালভ থেকে রক্ত লিক করছিল এবং হৃদযন্ত্রের প্রকোষ্ঠে বড় ছিদ্র ছিল। অন্যদিকে, সুইটির হৃদযন্ত্রের প্রকোষ্ঠের ছিদ্রের কারণে তার ফুসফুসে বিপজ্জনক মাত্রায় রক্তচাপ বেড়ে গিয়েছিল। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হৃদরোগের সমস্যার সমাধান করা হলেও, অস্ত্রোপচারের পরবর্তী পর্যায়ে উভয় শিশুই বড় সংকটে পড়ে। তাদের হৃদযন্ত্র নিজে থেকে কাজ করতে ব্যর্থ হয়। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা জীবনদায়ী প্রযুক্তি ‘একমো’ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন।
একমো কী এবং কেন এটি প্রয়োজন? এক্সট্রাকর্পোরিয়াল মেমব্রেন অক্সিজেনেশন বা একমো হলো একটি উন্নত প্রযুক্তি, যা সাময়িকভাবে হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের কাজের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয়। শরীরের বাইরে রক্ত সঞ্চালন ও অক্সিজেন সরবরাহের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলিকে সচল রাখে এবং হৃদযন্ত্রকে সুস্থ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দেয়।
চ্যালেঞ্জিং চিকিৎসা: চিকিৎসকদের কথায়, শিশুদের ক্ষেত্রে একমো পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। রক্ত জমাট বাঁধা আটকানো এবং একই সঙ্গে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি সামলানো ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। চিকিৎসক কুন্তল রায়চৌধুরী জানান, হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচারের পর মাত্র ২ থেকে ৮ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে একমো সাপোর্টের প্রয়োজন হয়। এই প্রক্রিয়ায় সঠিক সময় সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং চিকিৎসক, নার্স ও পারফিউশনিস্টদের সমন্বিত প্রচেষ্টাই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
টানা ১১০ ঘণ্টা গভীর পর্যবেক্ষণের পর দুই শিশুর হৃদযন্ত্র যখন পর্যাপ্ত শক্তি ফিরে পায়, তখনই ধাপে ধাপে একমো সাপোর্ট সরিয়ে নেওয়া হয়। বর্তমানে র্যাচেল ও সুইটি দুজনেই বিপদমুক্ত ও সুস্থ।
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল যে, সঠিক প্রযুক্তি এবং বিশেষজ্ঞদের নিরবচ্ছিন্ন তৎপরতা থাকলে কীভাবে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব কচি প্রাণগুলোকে। হাসপাতালের এই সাফল্যে খুশি দুই শিশুর পরিবার।





