সরকারি চাকরি ছেড়ে পোল্ট্রি ফার্ম! বছরে ২৫ লক্ষ টাকা কামিয়ে তাক লাগিয়ে দিলেন উত্তরপ্রদেশের এই পশুচিকিৎসক!

আজকের এই আধুনিক কর্মব্যস্ত বিশ্বে, যেখানে বেশিরভাগ তরুণ-তরুণী একটি সুরক্ষিত ও গৎবাঁধা সরকারি বা বেসরকারি চাকরিকেই তাদের কর্মজীবনের প্রধান ভিত্তি বলে মনে করেন, ঠিক সেই সময়েই এমন কিছু ব্যতিক্রমী মানুষ থাকেন যারা সব ঝুঁকি মাথায় নিয়ে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের নিজস্ব পথ নিজেরাই তৈরি করে নেন। ঠিক এমনই একটি অত্যন্ত অনুপ্রেরণামূলক ও চমকপ্রদ গল্প এবার প্রকাশ্যে এসেছে উত্তরপ্রদেশের বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলের ঐতিহাসিক চিত্রকূট থেকে, যেখানে একজন পেশাদার পশুচিকিৎসক তাঁর নিরাপদ চাকরিকে চিরতরে বিদায় জানিয়ে একটি লাভজনক পোল্ট্রি খামার বা মুরগির ফার্ম শুরু করেছেন এবং অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে এক নতুন ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

বর্তমানে তিনি শুধু নিজের গ্রামে নয়, বরং গোটা অঞ্চলে লক্ষ লক্ষ টাকার একটি সমৃদ্ধশালী ব্যবসা সফলভাবে গড়ে তুলেছেন এবং তাঁর পূর্বের মাসিক চাকরির বেতনের তুলনায় বর্তমানে প্রায় চারগুণ বেশি অর্থ উপার্জন করছেন। এই অদম্য সাফল্যের অনুপ্রেরণামূলক গল্পটি চিত্রকূট জেলার মৌ তহসিলের অন্তর্গত পিয়ারা গ্রামের কৃতি সন্তান ডঃ পুষ্পেন্দ্র সিং-এর, যিনি তাঁর পোল্ট্রি খামারটিকে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এখন তিনি তাঁর ফার্মে উৎপাদিত হাজার হাজার ডিম স্থানীয় ও পার্শ্ববর্তী বাজারে বিক্রি করে তাঁর পুরোনো পেশার চেয়ে বহুগুণ বেশি লাভ ঘরে তুলছেন।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পোল্ট্রি খামারি ডঃ পুষ্পেন্দ্র সিং এর আগে হরিয়ানা এবং উন্নাওয়ের মতো বিভিন্ন অঞ্চলে একটানা নয় বছর ধরে একজন বেসরকারি পশুচিকিৎসক হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার পরেও তিনি তাঁর আর্থিক আয় ও ক্যারিয়ারের অগ্রগতিতে সন্তুষ্ট হতে পারেননি, যার ফলে তিনি এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন—চাকরি ছেড়ে নিজের জন্মভিটে গ্রামে পাকাপাকিভাবে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত। গ্রামে ফিরে এসেই তিনি প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজের একটি বিশাল পোল্ট্রি খামার শুরু করার প্রাথমিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

পরবর্তীতে তিনি উত্তর প্রদেশ সরকারের জনকল্যাণমূলক পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতি ২০২২-এর সুযোগ গ্রহণ করে ইন্ডিয়ান ব্যাংক থেকে প্রায় ৭০ লক্ষ টাকার একটি মোটা অঙ্কের ঋণ বা লোন অনুমোদন করান। এরপর তিনি চিত্রকূটের একটি অত্যন্ত সাধারণ ছোট গ্রামে নিজের স্বপ্নের পোল্ট্রি খামারটি স্থাপন করেন। বর্তমান সময়ে তিনি শুধু চিত্রকূটের স্থানীয় বাজারেই নয়, বরং পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলাগুলোতেও তাঁর খামারে উৎপাদিত ডিম ও অন্যান্য পণ্য অত্যন্ত সফলভাবে পাইকারি ও খুচরা মূল্যে সরবরাহ করে চলেছেন।

ডঃ পুষ্পেন্দ্র সিং সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান যে, তিনি অতীতে একজন ডাক্তার হিসেবে অত্যন্ত পরিশ্রম করলেও চাকরি থেকে প্রত্যাশিত আর্থিক সচ্ছলতা না পাওয়ায় তিনি স্বাধীন ব্যবসা শুরু করার কঠিন পথটি বেছে নেন। ২০২৩ সালে তাঁর পিতার দুঃখজনক মৃত্যুর পর তিনি বাধ্য হয়ে পাকাপাকিভাবে নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। এর ঠিক কিছুদিন পরেই, তিনি ব্যাংক থেকে সরকারি ভর্তুকিযুক্ত ঋণ নিয়ে প্রায় ১২,JsonKey হাজার মুরগি পালনের একটি সুবৃহৎ বাণিজ্যিক প্রকল্প শুরু করেন।

এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের মাধ্যমে তাঁর খামারে বর্তমানে প্রতিদিন নিয়মিতভাবে প্রায় ১১,৪০০টি ডিম উৎপাদিত হচ্ছে। তিনি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানান যে, তাঁর বর্তমান ব্যবসার বার্ষিক টার্নওভার প্রায় দেড় কোটি বা ১৫ মিলিয়ন রুপি ছুঁয়েছে এবং সমস্ত খরচ বাদে তাঁর নিট বার্ষিক আয় প্রায় ২৫ লক্ষ রুপির কাছাকাছি পৌঁছেছে। তিনি গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, তিনি মাত্র এক বছরের সংক্ষিপ্ত ব্যবসায়িক যাত্রার মধ্যেই এই ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।

ডিমের ক্রমবর্ধমান ও লাগাতার চাহিদার কথা মাথায় রেখে তিনি আগামী এক বছরের মধ্যেই এলাকায় দ্বিতীয় আরেকটি বিশাল পোল্ট্রি খামার খোলার সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। শুধু নিজের আর্থিক সমৃদ্ধিই নয়, বরং এই পোল্ট্রি খামারের মাধ্যমে তিনি এলাকার প্রায় ১০ জন বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগও করে দিয়েছেন। তিনি সাধারণত প্রতি তিন থেকে চার দিন অন্তর নিয়মিতভাবে উৎপাদিত ডিম বাজারে বিক্রি করেন। তিনি আরও জানান যে, রাজ্য সরকারের পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতির অধীনে নেওয়া ঋণের ওপর তিনি সরকারের পক্ষ থেকে আকর্ষণীয় ৭ শতাংশের ভর্তুকি বা সাবসিডিও লাভ করেছেন।

পরিশেষে বলা যায়, ডঃ পুষ্পেন্দ্র চিত্রকূটের সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের মধ্যে অন্যতম যিনি এত বড় পরিসরে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পোল্ট্রি খামার শুরু করেছেন এবং আজ প্রতি মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা লাভ করছেন। তাঁর এই রূপকথার মতো সাফল্যের গল্প আজ সমাজ ও তরুণ প্রজন্মের কাছে এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা, যা প্রমাণ করে যে সঠিক নিষ্ঠা, সাহস এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে যেকোনো কঠিন কাজকেই সহজে সফল রূপ দেওয়া সম্ভব।