ইরান-সংকটকালে তেলের বাজারে বড় চাল ভারতের! লাতিন আমেরিকার দিকে হাত বাড়াল নয়াদিল্লি

ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার আবহে হরমুজ প্রণালীতে ভূ-রাজনৈতিক সংকট যখন ঘনীভূত, তখন ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে বড়সড় কৌশলগত পরিবর্তন আনল নয়াদিল্লি। অপরিশোধিত তেলের জন্য এবার মধ্যপ্রাচ্য বা রাশিয়ার ওপর একচেটিয়া নির্ভরতা কমিয়ে ভারত দৃষ্টি ঘোরাল লাতিন আমেরিকার দিকে। আন্তর্জাতিক শিপিং ট্র্যাকিং সংস্থা ‘কেপলার’-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, আগস্ট মাসে ভেনিজুয়েলা থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানি এক লাফে অনেকটা বেড়ে গেছে। বর্তমানে ভেনিজুয়েলা ভারতের চতুর্থ বৃহত্তম তেল সরবরাহকারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগস্ট মাসে ভারত প্রতিদিন ভেনিজুয়েলা থেকে গড়ে ৪,৪৪,০০০ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই পরিমাণ ইরাক (১,১৮,০০০ বিপিডি) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (১,৫৩,০০০ বিপিডি) থেকেও অনেকটাই বেশি। গত এপ্রিল মাসে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার পর থেকে ভেনিজুয়েলা থেকে তেল আমদানি আবার শুরু হয় এবং খুব দ্রুতই ভারত তার সরবরাহকারী তালিকায় এই দক্ষিণ আমেরিকান দেশটির গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলেছে। তবে তালিকার শীর্ষে এখনো রাশিয়া। আগস্ট মাসেও ভারত রাশিয়া থেকে প্রায় ২০ লক্ষ বিপিডি তেল সংগ্রহ করেছে। যদিও জুন-জুলাই মাসে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ২৬ লক্ষ বিপিডি, যা ভারতের মোট আমদানির অর্ধেকেরও বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত বর্তমানে বহুমুখী কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে। কেপলারের বিশ্লেষক সুমিত রিতোলিয়া জানিয়েছেন, ভারত কেবল একটি উৎসের ওপর নির্ভরশীল থাকতে রাজি নয়। একদিকে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে ভেনিজুয়েলা, ব্রাজিল ও পশ্চিম আফ্রিকার মতো নতুন নতুন উৎস থেকে তেল সংগ্রহ করে পরিবহন পথ ও সরবরাহকারীদের বৈচিত্র্য আনা হচ্ছে। সেইসঙ্গে গ্যাস, জৈব জ্বালানি এবং ইলেকট্রিক যানবাহনের মতো বিকল্প শক্তির ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। রিতোলিয়ার কথায়, মধ্যপ্রাচ্য থেকে পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নেওয়া ভারতের জন্য অর্থনৈতিকভাবে বুদ্ধিমানের কাজ হবে না, কারণ ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে সেখান থেকে তেল পরিবহন খরচ ও সময় অনেক কম লাগে।

তবুও, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের রিফাইনারিগুলো কেনাকাটার ক্ষেত্রে অভাবনীয় নমনীয়তা দেখাচ্ছে। পশ্চিম এশিয়া, রাশিয়া এবং আটলান্টিক বেসিনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে ভারত তার দৈনিক প্রায় ৫০ লক্ষ বিপিডি আমদানির চাহিদা পূরণ করে চলেছে। তবে এই বৈচিত্র্য আনার পেছনে কিছু আর্থিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ভেনিজুয়েলা বা লাতিন আমেরিকার দেশগুলো থেকে দীর্ঘ সমুদ্রপথে তেল আনার ফলে মালবাহী জাহাজ ভাড়া (ফ্রেইট) এবং বিমা খরচ অনেকটাই বেড়ে যায়। এর ফলে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে ভারতের আমদানি বিলের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।

ভারতে জ্বালানি তেলের চাহিদা বিশ্বজুড়ে ক্রমেই বাড়ছে। পরিবহন, বিমান চলাচল এবং ক্রমবর্ধমান শিল্পায়নের ফলে পেট্রোল-ডিজেলের চাহিদা অদূর ভবিষ্যতে কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। ইলেকট্রিক যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও, ভারতের বর্তমান বিপুল যানবাহন বেড়া বা বহরে এর প্রভাব পড়তে এখনো অনেক সময়ের প্রয়োজন। তাই, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ভারত তার তেল সরবরাহ চেইনকে মজবুত করতে এবং ভবিষ্যতের জ্বালানি সংকট এড়াতে ভেনিজুয়েলার মতো নতুন বাজারের ওপর নির্ভর করে এক ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক রণকৌশল সাজিয়েছে, যা ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সহায়ক হবে।