ইতিহাস গড়ল ভারত! মহাকাশ থেকে উপগ্রহের ইশারায় রানওয়ে ছুঁল ইন্ডিগোর বিমান

গত ২৭ জুন উদয়পুর বিমানবন্দরে ইন্ডিগোর একটি এয়ারবাস এ৩২০ বিমান অবতরণের সময় এক নীরব ইতিহাস রচিত হলো। যাত্রী সাধারণ হয়তো টেরই পাননি, কিন্তু বিমান চলাচলের ইতিহাসে এটি ছিল এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। এতদিন বড় শহরের রানওয়েতে বিমান নামানোর জন্য মাটির ‘গ্রাউন্ড-বেসড রেডিও বিম’ বা বেতার তরঙ্গের উপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু এবার সেই নির্ভরতা কাটিয়ে ভারতের নিজস্ব উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের ইশারায় রানওয়ে স্পর্শ করল ইন্ডিগোর এই যাত্রীবাহী জেট। ডিরেক্টরেট জেনারেল অব সিভিল অ্যাভিয়েশন (DGCA)-এর নজরদারিতে ভারতের প্রথম যাত্রীবাহী জেট হিসেবে দেশীয় প্রযুক্তির ‘গগন’ (Gagan) নেভিগেশন সিস্টেমের সাহায্যে এই সফল ল্যান্ডিং সম্পন্ন হলো। এর আগে ছোট টার্বোপ্রপ বিমান এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও, এয়ারবাস এ৩২০-র মতো বড় বাণিজ্যিক বিমান ভারতে এই প্রথম গগন-এর হাত ধরে রানওয়ে ছুঁল।
কী এই ‘গগন’ এবং এর কার্যকারিতা?
‘গগন’-এর পূর্ণরূপ হলো ‘জিপিএস এইডেড জিও অগমেন্টেড নেভিগেশন’। এটি ইসরো (ISRO) এবং ‘এয়ারপোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়া’ (AAI)-এর যৌথ অবদান। মূলত ইসরোর ‘জিএসএটি-৮’ এবং ‘জিএসএটি-১০’ উপগ্রহ থেকে এই সিগন্যাল পাওয়া যায়। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এটি কি ‘নাবিক’ (NavIC)-এর মতো? আদতে তা নয়। ‘নাবিক’ একটি স্বাধীন পজিশনিং নেটওয়ার্ক, আর ‘গগন’ হলো আমেরিকার জিপিএস সিগন্যালের রক্ষাকর্তা। এটি জিপিএস সিগন্যালের ভুলত্রুটি শুধরে তাকে নিখুঁত করে তোলে।
কেন এই প্রযুক্তি এতটা গুরুত্বপূর্ণ?
আমাদের ফোনে ব্যবহৃত সাধারণ জিপিএস কয়েক মিটারের এদিক-ওদিক হতে পারে, যা একটি ৭০ টনের বিশাল বিমানকে অবতরণ করানোর জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মহাকাশ থেকে সিগন্যাল যখন পৃথিবীতে আসে, তখন বায়ুমণ্ডলের আয়নোস্ফিয়ারে তা বাধা পেয়ে বেঁকে যায়। ভারতে এই বায়ুমণ্ডলীয় গোলমালের প্রভাব অনেক বেশি। এই সমস্যা মেটাতে ভারতজুড়ে ১৫টি অতি নিখুঁত গ্রাউন্ড স্টেশন বসানো হয়েছে। জিপিএস সিগন্যালে সামান্যতম ভুল থাকলেই এই স্টেশনগুলো তা ধরে ফেলে এবং সংশোধিত সিগন্যালটি উপগ্রহের মাধ্যমে বিমানের রিসিভারে পাঠিয়ে দেয়। যদি সিগন্যাল নিখুঁত না হয়, তবে গগন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পাইলটকে সতর্ক করে দেয়।
ভারতের জন্য এর গুরুত্ব:
এই ল্যান্ডিংয়ের প্রযুক্তিকে বলা হয় ‘এলপিভি’ (LPV) অ্যাপ্রোচ। সাধারণত নিখুঁত ল্যান্ডিংয়ের জন্য বিমানবন্দরে কোটি কোটি টাকার ‘ইনস্ট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম’ (ILS) বসাতে হয়। গগন প্রযুক্তির দৌলতে এখন কোনো দামি যন্ত্রপাতি ছাড়াই মহাকাশের সাহায্য নিয়ে নিরাপদ অবতরণ সম্ভব। এটি ভারতের ছোট শহরগুলির বিমানবন্দরের জন্য এক বৈপ্লবিক আশীর্বাদ। খারাপ আবহাওয়াতেও বিমান আর ডাইভার্ট করতে হবে না, বরং ছোট বিমানবন্দরের নিরাপত্তাও বহুগুণ বাড়বে। বিশ্বের মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি দেশের কাছে এই প্রযুক্তি রয়েছে এবং বিষুবরেখার কঠিন আকাশসীমায় ভারতই প্রথম এই সাফল্য অর্জন করে বিশ্বমঞ্চে অনন্য নজির গড়ল।