“আর অস্ত্রোপচার সম্ভব নয়…” ক্যানসারের থাবায় বিপর্যস্ত জীবন, হাসিমুখে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে চলা এই অভিনেত্রীকে চেনেন?

ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক লড়াইয়ে ফের একবার চরম পরীক্ষার মুখে এসে দাঁড়িয়েছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও সমাজকর্মী নাফিসা আলি। দীর্ঘ বছর ধরে মারণরোগের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার পর এবার তাঁর শরীরে নতুন করে বাসা বেঁধেছে জটিলতা। স্টেজ ৪ ওভারিয়ান এবং পেরিটোনিয়াল ক্যানসারের বিরল চিকিৎসার মধ্যেই সাম্প্রতিক একটি পিইটি-সিটি (PET/CT) স্ক্যান রিপোর্ট নতুন করে গভীর আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁর লিভারের উপরিভাগে নতুন করে ক্যানসারের ডিপোজিট বা ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। রোগের এই আকস্মিক ও বিপজ্জনক অগ্রগতির পরেই চিকিৎসাপদ্ধতিতে বড়সড় বদল এনেছেন বিশেষজ্ঞরা, এবং শুরু হয়েছে অত্যাধুনিক টার্গেটেড থেরাপি।
স্মরণ করা যেতে পারে, ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে প্রথমবার নাফিসা আলির শরীরে স্টেজ ৩ পেরিটোনিয়াল ও ওভারিয়ান ক্যানসার ধরা পড়েছিল। সেসময়ে দীর্ঘ ও কনিষ্ঠ চিকিৎসাপদ্ধতির পর ২০১৯ সালে তিনি করোনামুক্ত বা ক্যানসারজয়ী হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ক্যানসার ফের কামড় বসায়। ২০২৫ সালে একটি রুটিন পিইটি স্ক্যানের মাধ্যমে জানা যায় যে রোগটি কেবল ফিরে আসেইনি, বরং তা অত্যন্ত মারাত্মকভাবে স্টেজ ৪-এ পৌঁছে গিয়েছে। সেই সময়ই অভিনেত্রী নিজেই প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন যে তাঁর শরীর এখন আর অস্ত্রোপচার সহ্য করার মতো অবস্থায় নেই, ফলে তাঁকে সম্পূর্ণভাবে কেমোথেরাপির দীর্ঘ ও কষ্টকর রাস্তার ওপর ভরসা করতে হচ্ছে।
তবে এই দুর্বিষহ পরিস্থিতিও নাফিসার অদম্য জেদ ও লড়াকু মানসিকতাকে দমাতে পারেনি। একাধিক কেমোথেরাপির ধকল ও শারীরিক কষ্ট সহ্য করার পাশাপাশি তিনি নিজের জীবনযাপন এবং অভিনয় পেশাকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। চলতি বছরের জুলাই মাসেও তিনি সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেছিলেন যে তাঁর জীবনের দশম কেমোথেরাপি পর্ব সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। চিকিৎসার ফাঁকে গোয়ার সমুদ্র সৈকতে একান্তে সময় কাটানো থেকে শুরু করে ১১ হাজার ফুট উচ্চতায় পরিবারের সঙ্গে পাহাড়ি ট্রেকে অংশ নেওয়া—বারবার তিনি প্রমাণ করেছেন যে মনের জোর থাকলে মৃত্যুকেও চ্যালেঞ্জ জানানো সম্ভব।
কিন্তু সাম্প্রতিক স্ক্যানের রিপোর্ট সেই আশার আলোয় কিছুটা হলেও ছায়া ফেলেছে। নাফিসা নিজেই সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে পিইটি-সিটি স্ক্যানে দেখা গিয়েছে তাঁর ওভারিয়ান ও পেরিটোনিয়াল ক্যানসার আরও আগ্রাসী রূপ নিয়েছে এবং লিভারের উপরিভাগে নতুন ক্যানসার ডিপোজিট তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে চিকিৎসকেরা সঙ্গে সঙ্গেই চিকিৎসার রূপরেখা বদলে ফেলে টার্গেটেড থেরাপি শুরু করেছেন। ক্যানসারের এই দীর্ঘ ও বন্ধুর পথচলায় তিনি বারবার নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছেন। অতীতে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে সাধারণ পেটের ব্যথাকে অবহেলা করার জন্যই রোগটি প্রথমে ধরা পড়তে দেরি হয়েছিল এবং যখন শনাক্ত করা গিয়েছিল, তখন তা অনেকটাই ছড়িয়ে পড়েছিল।
অসুস্থতার সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি তিনি নিজের পেশাগত দায়িত্ব থেকে দূরে সরে থাকেননি। জনপ্রিয় ছবি ‘ম্যাক্স, মিন অ্যান্ড মিওজাকি’ (Max, Min and Meowzaki)-তে কাজ করার সময়ও তাঁর ক্যানসারের চিকিৎসা সমান্তরালভাবে চলেছে। তাঁর মতে, অভিনয় শুধুমাত্র বিনোদন নয়, বরং মানুষের কাছে জীবন সংগ্রামের জোরালো বার্তা পৌঁছে দেওয়ার একটি মাধ্যম। চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় যখন চুল ঝরে পড়তে শুরু করেছিল, তখন তাঁর ছোট্ট নাতি-নাতনিরা দাদিমার সঙ্গে সংহতি জানিয়ে নিজেরাই নিজেদের মাথা মুড়িয়ে ফেলেছিল, যে আবেগঘন মুহূর্তটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।
চিকিৎসকদের মতে, স্টেজ ৪ ওভারিয়ান ক্যানসার অত্যন্ত জটিল এবং জীবন সংশয়ী পরিস্থিতি। তবে রোগীর মানসিক জোর, শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সঠিক সময়ে সঠিক থেরাপি শুরু করার ওপর নির্ভর করে লড়াইয়ের ময়দান দীর্ঘায়িত করা সম্ভব। টার্গেটেড থেরাপি বর্তমান যুগে এই ধরনের জটিল ক্যানসারের চিকিৎসায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। নাফিসা আলির সামনে এখন চিকিৎসার এক নতুন ও কঠিন অধ্যায় শুরু হয়েছে। শরীর তাঁকে প্রতিনিয়ত কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়া করালেও, তিনি প্রতিবারই আরও বেশি দৃঢ়তা ও ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে ফিরে আসেন। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া এই অসম যুদ্ধ আজও থামেনি, বরং নতুন চিকিৎসা ও নতুন আশার আলো নিয়ে জীবনের শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার শপথ নিয়েই তিনি এগিয়ে চলেছেন।