আজ গণেশ চতুর্থী: কোন সময়ে বাপ্পাকে ঘরে আনলে দূর হবে সমস্ত বাধা?

হিন্দু সনাতন ধর্মে গণেশ চতুর্থী অন্যতম প্রধান ও অত্যন্ত পবিত্র উৎসব। এই দিনটিকে বিঘ্নহর্তা, পরম জ্ঞান এবং জীবনের যেকোনো শুভ সূচনার দেবতা ভগবান গণেশের জন্মোৎসব হিসেবে অত্যন্ত ভক্তি ও উল্লাসের সঙ্গে পালন করা হয়। পঞ্জিকা মতে, চলতি বছর ২০২৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর, সোমবার সাড়ম্বরে পালিত হচ্ছে গণেশ চতুর্থী। হিন্দু ক্যালেন্ডার অনুসারে, ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথিতে ভক্তরা তাদের প্রিয় গণপতি বাপ্পাকে অত্যন্ত আনন্দ ও উদ্দীপনার সঙ্গে নিজ নিজ গৃহে স্বাগত জানান। ভগবানকে ঘরে বরণ করে নেওয়ার আগে ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, সুন্দর করে সাজানো, পুজোর নির্দিষ্ট স্থান প্রস্তুত করা এবং সমস্ত প্রয়োজনীয় পূজাসামগ্রী আগে থেকেই গুছিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। সঠিক ও নিখুঁত প্রস্তুতি থাকলে পরিবারের প্রতিটি সদস্য কোনো ধরনের ব্যস্ততা বা বিঘ্ন ছাড়াই সম্পূর্ণ ভক্তি ও পবিত্রতার সঙ্গে এই মহাসমারোহে অংশ নিতে পারেন।

বাড়ি পরিষ্কার ও পবিত্র করার গুরুত্ব অপরিসীম। ভক্তরা মনে করেন যে গণপতি বাপ্পার আগমন ঘরের সমস্ত নেতিবাচক শক্তি দূর করে এবং সুখ-সমৃদ্ধি নিয়ে আসে। তাই দেবতার আগমনকে সুনিশ্চিত করতে বাড়িকে আগে থেকেই প্রস্তুত করা দরকার। প্রথমেই পুরো বাড়িটি তন্নতন্ন করে পরিষ্কার করে নিন, বিশেষ করে সেই নির্দিষ্ট স্থানটি যেখানে গণেশের মূর্তিটি স্থাপন করা হবে। মেঝে ভালোভাবে পরিষ্কার করুন, আসবাবপত্র ও কর্নারের ধুলো ঝেড়ে ফেলুন এবং সমস্ত অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে ঘর ফাঁকা ও পরিপাটি করুন। বাড়ির মূল প্রবেশদ্বার এবং পুজোর ঘর বা কোণটির প্রতি বিশেষ যত্ন নিন, কারণ এই স্থানগুলিই উৎসবের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

এরপর আসে পুজোর স্থান নির্বাচনের পালা। গণপতি স্থাপনের জন্য বাড়ির একটি পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন এবং শান্ত কোণ বেছে নিন। ফুল, রঙ্গোলি, আম পাতা, সুন্দর তোরন, রঙিন আলো এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী সাজসজ্জার উপকরণ দিয়ে সেই জায়গাটি মনোরম করে তুলুন। একটি পরিচ্ছন্ন কাঠের চৌকি বা বেদীর ওপর দেবতার মূর্তিটি স্থাপন করতে হবে। বেদীর চারপাশে পর্যাপ্ত খালি জায়গা রাখুন, যাতে পরিবারের সমস্ত সদস্য এবং আগত অতিথিরা আরামে বসে একসঙ্গে পুজোয় অংশ নিতে পারেন।

শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা এড়াতে পুজোর সমস্ত প্রয়োজনীয় সামগ্রী আগেই সংগ্রহ করে রাখুন। পারিবারিক ঐতিহ্য ও নিয়ম মেনে সাধারণত যে জিনিসগুলি প্রয়োজন হয় তার মধ্যে রয়েছে একটি পরিষ্কার চৌকি বা বেদী, লাল বা হলুদ রঙের পবিত্র বস্ত্র, তাজা ফুল ও মালার সেট, পবিত্র দূর্বা ঘাস, ভগবান গণেশের প্রিয় মোদক বা অন্যান্য সুস্বাদু মিষ্টি, নানা ধরনের ফল, ধূপকাঠি, প্রদীপ ও তুলোর সলতে, কর্পূর, রোলি বা কুমকুম, অক্ষত বা অটুট চাল, পবিত্র কলস, নারকেল, পঞ্চামৃত তৈরির সমস্ত উপকরণ, পুজোর থালা এবং শুদ্ধ জল। এই সমস্ত জিনিস আগে থেকে জোগাড় করে রাখলে পুজোর সময় কোনো ধরনের অসুবিধা হয় না।

সঠিক এবং মানানসই মূর্তি নির্বাচন করাও এই পুজোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আজকাল বহু পরিবেশসচেতন ভক্ত প্রাকৃতিক মাটি দিয়ে তৈরি ইকো-ফ্রেন্ডলি বা পরিবেশ-বান্ধব গণেশ মূর্তি বেছে নিচ্ছেন। মূর্তি কেনার সময় পরিবারের সদস্যরা উপলব্ধ জায়গার পরিমাণ, মূর্তির মাপ এবং উপাদানের কথা মাথায় রাখতে পারেন। এমন মূর্তি নির্বাচন করা উচিত যা অত্যন্ত যত্ন ও শ্রদ্ধার সঙ্গে বাড়িতে আনা যায় এবং পুজোর নির্দিষ্ট স্থানে সহজে স্থাপন করা যায়। এর ফলে প্রতিদিনের পুজো এবং পরবর্তীতে বিসর্জনের কাজ অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়।

বাপ্পা ঘরে আসার আগেই ঘর সাজানোর কাজ সম্পূর্ণ করে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ। ফুল, বাহারি আলো, কাপড়, নান্দনিক রঙ্গোলি এবং ঐতিহ্যবাহী তোরন ব্যবহার করে ঘরের ভেতর একটি পরিপূর্ণ উৎসবের আমেজ তৈরি করা যেতে পারে। অতিরিক্ত জাঁকজমক এড়িয়ে পরিবারগুলি সাধারণ ও পরিবেশবান্ধব সাজসজ্জাকেও প্রাধান্য দিতে পারে। বাপ্পা আসার আগেই ব্যাকড্রপ এবং পুজোর মঞ্চ তৈরি থাকলে ভক্তরা স্থাপনার পবিত্র মুহূর্তে পুরোপুরি পুজো ও প্রার্থনায় মন দিতে পারেন।

ভগবান গণেশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সবচেয়ে জনপ্রিয় ভোগগুলির মধ্যে অন্যতম হলো সুস্বাদু মোদক। পুজো চলাকালীন ফুল, পবিত্র দূর্বা ঘাস, তাজা ফল এবং নানা পদের মিষ্টি নিবেদন করা হয়। পুজো শুরু হওয়ার ঠিক আগে সবকিছু নিখুঁতভাবে প্রস্তুত রাখার জন্য পরিবারের উচিত আগে থেকেই প্রয়োজনীয় ভোগ তৈরি করে নেওয়া বা বাজার থেকে কিনে রাখা। একই সঙ্গে বিসর্জনের সঠিক পরিকল্পনাও আগে থেকেই করে রাখা উচিত। বাড়িতে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হবে নাকি কোনো অনুমোদিত ঘাটে নিয়ে যাওয়া হবে, সে বিষয়ে পরিবারের সকলের সম্মতি নিয়ে আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। ২০২৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার, মধ্যাহ্ন পুজোর সময় বাপ্পাকে ঘরে আনার সবচেয়ে শুভ মুহূর্ত শুরু হবে সকাল ১১:০২ মিনিটে এবং তা চলবে দুপুর ১:৩১ মিনিট পর্যন্ত। এই শুভ লগ্নে সঠিক নিয়মে পুজো সম্পন্ন করলে জীবনের সমস্ত বাধা কেটে যায়।