পুজোর আগেই কি বড় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন? বিজেপিতে নাম লেখাতে চলেছেন ১৭ জন সাংসদ!

রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে আচমকাই তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে এক বিস্ফোরক দাবিকে কেন্দ্র করে। দুর্গাপূজার ঠিক আগে অথবা পরেই রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড়সড় রদবদলের ইঙ্গিত মিলেছে। এনসিপিআই সাংসদ জগদীশ চন্দ্র বর্মা বসুনিয়া দাবি করেছেন যে, দলের ১৭ জন সাংসদ সরাসরি ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগ দিতে চলেছেন। এই সম্ভাব্য দলবদলের তালিকায় তিন জন সংখ্যালঘু সাংসদকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। তাঁর এই দাবি প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক উত্তাপ বহুগুণ বেড়ে গেছে।

জগদীশ চন্দ্র বর্মা বসুনিয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেছেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, দলত্যাগবিরোধী আইন বা অ্যান্টি-ডিফেকশন ল-এর আইনি জটিলতা ও কোপ থেকে রক্ষা পেতেই বিজেপি কৌশলগতভাবে তাঁদের এনসিপিআই দলে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। এখানেই শেষ নয়, তাঁর আরও দাবি যে আবু তাহের এবং খলিলুর রহমানের মতো নেতারাও এনডিএ জোটকে সমর্থন জানাবেন এবং তাঁদের বিভিন্ন দপ্তরের দায়িত্ব বা পদ দেওয়া হতে পারে। এই ধরনের প্রকাশ্য মন্তব্যের জেরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অলিন্দে শুরু হয়েছে জোর তরজা।

তবে এনসিপিআই সাংসদের এই সমস্ত দাবি সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দিয়েছে পদ্মশিবির। বিজেপির পক্ষ থেকে দেবজিৎ সরকার সাফ জানিয়েছেন যে, তাঁরা এ ধরনের কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন এবং জগদীশবাবু যা বলেছেন তার সম্পূর্ণ দায় একান্তভাবেই তাঁর নিজের।

অন্যদিকে, এই বিষয়ে রাজ্যের বিজেপি নেতৃত্বও অত্যন্ত কড়া অবস্থান নিয়েছে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এই প্রসঙ্গে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে অতীতের বিভিন্ন ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর থেকে রাজনৈতিক হিংসার যে আবহ তৈরি হয়েছিল, তা দল ভুলে যায়নি। তাঁর মতে, কেউ চাইলেই রাতেরারা বিজেপির পতাকা হাতে তুলে নিয়ে নিজেদের সমস্ত অতীত পাপাচার বা অন্যায় ধুয়ে মুছে সাফ করে ফেলতে পারবে—এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই।

জগদীশ বসুনিয়ার দলবদলের দাবিকে সম্পূর্ণ অবাস্তব ও উড়িয়ে দিয়ে শমীক ভট্টাচার্য তীক্ষ্ণ কটাক্ষ করেছেন। তিনি বলেন যে ওই নেতা অন্য কোনো রাজ্যের একটি দলে রয়েছেন এবং তাঁর এই দাবি সম্ভবত মঙ্গলগ্রহের কোনো বিজেপি ইউনিট থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এর পাশাপাশি রবিবার এক প্রতিক্রিয়ায় শমীক ভট্টাচার্য আরও মন্তব্য করেছিলেন যে, এই সমস্ত ঘটনা মূলত শাসক দলের অভ্যন্তরীণ বা পারিবারিক বিষয়। কে কোন দলে যোগ দেবেন কিংবা কার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে, তা সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব ব্যাপার এবং এ নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি তাঁর নিজের দলেরও কোনো আগ্রহ নেই।

এদিকে, এই রাজনৈতিক জল্পনা ও দাবির নেপথ্যে রয়েছে জগদীশ বসুনিয়ার সাম্প্রতিক কিছু বিতর্কিত অভিজ্ঞতা। গত ১০ আগস্ট রাতে পুলিশি নিরাপত্তার ঘেরাটোপে নিজের বাড়িতে প্রবেশ করতে গিয়ে তীব্র জনরোষ ও বিক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন এই সাংসদ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর বিধায়ক-স্ত্রী সঙ্গীতা রায় বসুনিয়াও, যিনি পরবর্তীতে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। গত ৪ মে নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পর থেকে এটি ছিল সিতাইয়ে তাঁর বাড়িতে দ্বিতীয়বারের মতো প্রবেশ এবং প্রতিবারই তাঁকে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

স্থানীয় ক্ষুব্ধ জনতা ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, জগদীশ বসুনিয়া বিগত ১৫ বছর ধরে ব্যাপক দুর্নীতিতে লিপ্ত রয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত সুবিধাবাদী এবং তিনি রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী বারবার দলবদল করেছেন—কখনও বামফ্রন্ট, কখনও তৃণমূল কংগ্রেস, আবার কখনও এনসিপিআই-এর ছাতার তলায় আশ্রয় নিয়েছেন। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, নিজের বিরুদ্ধে জমা হওয়া জনরোষ ও বিতর্ক থেকে নজর ঘোরাতেই এবং রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এখন পুজোর আগে বিজেপিতে যোগদানের এই সস্তা তত্ত্ব সামনে আনছেন অভিযুক্ত সাংসদ।