আমেরিকার মাটিতেই তৈরি হবে সমস্ত ওষুধ! জেনেরিক ড্রাগের ওপর ২০০% শুল্ক বসানোর হুঙ্কার ট্রাম্পের

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প জেনেরিক ওষুধ আমদানির ক্ষেত্রে এক অভাবনীয় ও কঠোর নীতিগত পরিবর্তনের ঐতিহাসিক ঘোষণা করেছেন। তাঁর দ্ব্যর্থহীন দাবি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নিজস্ব ওষুধ উৎপাদন ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করতে এবং বিদেশি নির্ভরতা চিরতরে কমাতেই এই কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ২০২৬ সালের পহেলা আগস্ট থেকে এই নতুন ও কঠোর শুল্ক নীতি সম্পূর্ণভাবে কার্যকর করা হবে। তবে মার্কিন বাজারে জেনেরিক ওষুধের ধারাবাহিক জোগান বজায় রাখতে এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলিকে পর্যাপ্ত সময় দিতে প্রথম দুই বছর আমদানিকৃত জেনেরিক ওষুধের উপর কোনো ধরনের অতিরিক্ত শুল্ক ধার্য করা হবে না। এরপর তৃতীয় বছরে এসে একলাফে ১০০ শতাংশ এবং তার পরবর্তী বছর থেকে একেবারে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত লাগামছাড়া শুল্ক আরোপ করা হবে।
নিজের অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে এই বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়ে ট্রাম্প লিখেছেন যে, এই নতুন নীতির মূল এবং একমাত্র লক্ষ্য হল বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা জেনেরিক ওষুধের উৎপাদন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মাটিতে পুনরায় ফিরিয়ে আনা। তাঁর সাফ কথা, যেসব বহুজাতিক ও দেশীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে মার্কিন মুলুকে নিজস্ব উৎপাদন কেন্দ্র বা কারখানা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হবে, শুধুমাত্র তাদের আমদানি করা পণ্যের উপরেই এই উচ্চহারে শুল্ক কার্যকর করা হবে। একই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, পেটেন্টপ্রাপ্ত বা ব্র্যান্ডেড এবং অত্যাধুনিক উদ্ভাবনী জীবনদায়ী ওষুধের ক্ষেত্রে পূর্বের বর্তমান নীতিই সম্পূর্ণরূপে অপরিবর্তিত রাখা হবে।
মার্কিন প্রশাসনের এই হঠাৎ ঘোষণায় ভারতীয় ওষুধ শিল্পের ওপর সুদূরপ্রসারী ও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে তীব্র আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা। উল্লেখ্য, ভারতকে বিশ্বজুড়ে সর্বসম্মতভাবে ‘বিশ্বের ফার্মেসি’ বলে অভিহিত করা হয়, কারণ বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশে সাশ্রয়ী মূল্যে জীবনদায়ী জেনেরিক ওষুধ সরবরাহ করে থাকে ভারতের নামী-দামী সংস্থাগুলি। পরিসংখ্যান বলছে, কেবল মার্কিন বাজারের চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ জেনেরিক ওষুধই একাই সরবরাহ করে থাকে বিভিন্ন ভারতীয় ফার্মা কোম্পানি। বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ভারত একাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৯.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের ওষুধ রফতানি করেছে, যা ভারতের মোট ২৫.৮ বিলিয়ন ডলারের সমগ্র ফার্মাসিউটিক্যাল রফতানির প্রায় ৩৮ শতাংশ। ফলস্বরূপ, মার্কিন বাজারে এই বিপুল পরিমাণ শুল্ক বৃদ্ধি পেলে ভারতীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির ব্যবসা ও লাভজনকতার ওপর যে বিরাট ধাক্কা আসবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
যদিও এই নতুন শুল্ক নীতি বাস্তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভারতীয় কোম্পানিগুলির ওপর ঠিক কতটা ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে এখনও সম্পূর্ণ নিশ্চিত চিত্র সামনে আসেনি। কারণ, চলতি বছরের একদম শুরুর দিকে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের মধ্যে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিতে জেনেরিক ওষুধ এবং তার প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে বিশেষ আলোচনার ভিত্তিতে কিছু বাণিজ্যিক সুবিধার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে সেই পূর্বের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির নির্দিষ্ট শর্তগুলি মার্কিন প্রশাসনের এই নবঘোষিত নীতির সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা নিয়ে বর্তমানে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক মহলে বড়সড় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
বিশেষ উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, জটিল সংক্রামক রোগ, মানসিক স্বাস্থ্য এবং জন্মনিয়ন্ত্রণের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জীবনদায়ী চিকিৎসায় ভারতীয় জেনেরিক ওষুধের ব্যাপক ও দৈনন্দিন ব্যবহার রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের সুচিন্তিত মত অনুসারে, যদি এই উচ্চ শুল্ক নীতি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরোপুরি কার্যকর করা হয়, তবে ভারতীয় ওষুধ সংস্থাগুলির সামনে দুটিমাত্র পথ খোলা থাকবে—হয় তাদের মার্কিন মাটিতেই উৎপাদন কেন্দ্র গড়ার খরচ বহন করতে হবে, নতুবা বিশ্ব বাজারে সম্পূর্ণ নতুন বিকল্প বাণিজ্য বাজার খুঁজতে হবে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে সস্তার জেনেরিক ওষুধের জোগান কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই তার দাম মাত্রাতিরিক্তভাবে বৃদ্ধি পাবে, যার জেরে মার্কিন মুলুকের লক্ষ লক্ষ সাধারণ রোগীর চিকিৎসাগত মাসিক খরচও আকাশছোঁয়া হয়ে দাঁড়াবে।