অরুণাচলে কি সত্যিই থাবা বসাচ্ছে চিন? সেনার গতিবিধি ও সুরক্ষার কড়া বার্তা নিয়ে মুখ খুললেন খোদ সাংসদ কিরেন রিজিজু

অরুণাচল প্রদেশে নতুন করে চিনা সামরিক বাহিনীর অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলে সম্প্রতি যে সমস্ত চাঞ্চল্যকর দাবি সামনে এসেছে, তা সম্পূর্ণ ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উড়িয়ে দিলেন কেন্দ্রীয় সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু। দেশের সীমান্ত পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে জল্পনা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই পশ্চিম অরুণাচল লোকসভা কেন্দ্রের এই সাংসদ সীমান্ত এলাকার বর্তমান পরিস্থিতি এবং কেন্দ্র সরকারের সুদৃঢ় অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে অরুণাচলের আপার সুবানসিরি অঞ্চলে চিনা সামরিক গতিবিধি ও কথিত অনুপ্রবেশের নতুন খবর সামনে আসার পরেই সীমান্ত সুরক্ষা নিয়ে কেন্দ্র সরকারের ভাবনাচিন্তা ও রণকৌশল পরিষ্কার করতে আসরে নামেন রিজিজু। অতীতে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন তৎকালীন ইউপিএ সরকারকে কঠোর নিশানা করে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ২০১৩ সালের একটি পুরনো ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, সেই সময় তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এ কে অ্যান্টনি সংসদে নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে ভারতের সামগ্রিক কৌশলগত নীতিই ছিল সীমান্ত এলাকাগুলিকে অনুন্নত ও বিচ্ছিন্ন অবস্থাতেই রাখা। তবে রিজিজু এই কটাক্ষ করলেও রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০১৩ সালেই অ্যান্টনি স্পষ্ট করেছিলেন যে ইউপিএ সরকারের আমলেই পুরনো ও ভুল নীতি ঝেড়ে ফেলে সীমান্ত সড়ক ও পরিকাঠামো নির্মাণের কাজ জোরকদমে শুরু হয়েছিল।

রিজিজু জোরালোভাবে দাবি করেন যে, অতীতে সীমান্ত অঞ্চলগুলির প্রতি লাগাতার উদাসীনতা ও নজর না দেওয়ার যে পুরনো নীতি চালু ছিল, বর্তমান নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রীত্বে তা সম্পূর্ণ বদলে ফেলা হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে সীমান্ত পরিকাঠামো উন্নয়নকে ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’ দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান। আপার সুবানসিরি অঞ্চলে চিনের সাম্প্রতিক অনুপ্রবেশের সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় দাবি করেন যে, ভারতীয় সেনা এবং সীমান্ত সুরক্ষাবাহিনী দেশের অখণ্ডতা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

উল্লেখ্য, কিছুদিন আগেই সীমান্ত পরিস্থিতি ও চিনের আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে কেন্দ্রকে চরম আক্রমণ করেছিল প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবানসিরি অঞ্চলে চিনের আগ্রাসী মনোভাব এবং ভারতীয় সেনার পেট্রোলিংয়ে বাধা দেওয়ার চাঞ্চল্যকর রিপোর্টের পরই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছে কড়া ভাষায় জবাব তলব করেছিলেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ও শীর্ষ নেতা রাহুল গান্ধী। কেন্দ্রের কাছে একাধিক সংবেদনশীল প্রশ্ন তুলে খাড়গে জানতে চেয়েছিলেন যে, চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (PLA) কি তাকসিংয়ের কাছে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে? ভারত কি শেরা ফাইভ নামক নির্দিষ্ট পেট্রোলিং পয়েন্টে নিয়মিত যাতায়াতের অধিকার হারিয়েছে? কংগ্রেসের অভিযোগ ছিল যে, এই সংবেদনশীল সেক্টরে শীতকালে ভারতীয় সেনার পেট্রোলিং কেন সীমাবদ্ধ রাখা হয়, যেখানে চিনা ফৌজ সারাবছর নিজেদের উপস্থিতি বজায় রাখে? এছাড়া স্থানীয় উপজাতিদের চারণভূমি এবং শিকারের জায়গাগুলিতে ঢোকা ক্রমশ সমস্যাজনক হয়ে উঠছে কেন এবং পূর্ব লাদাখে ২০২০ সালের মে মাসের আগের ‘স্ট্যাটাস কো’ পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা হয়েছে কিনা, সেই প্রশ্নও তুলেছে কংগ্রেস। বিরোধী দলের অভিযোগ, আগের মে মাসের আগের অবস্থায় ভারতের সম্পূর্ণ অধিকার বজায় আছে কিনা, সে বিষয়ে দেশের মানুষকে অন্ধকারে রাখছে বর্তমান বিজেপি সরকার।

অন্যদিকে, এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেই সাম্প্রতিককালেই বিদেশ মন্ত্রকের তরফে স্পষ্ট জানানো হয় যে, চিনের সঙ্গে সীমান্ত সংক্রান্ত সমস্ত বিষয়গুলিকে ভারত অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচনা করে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সার্বিক গতিপ্রকৃতির জন্য সীমান্ত শান্ত রাখা অত্যন্ত জরুরি। তবে অরুণাচল সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় চিনা সামরিক তৎপরতার সাম্প্রতিক রিপোর্ট নিয়ে এখনও পর্যন্ত কেন্দ্র সরকারের তরফ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি বা যৌথ প্রতিক্রিয়া মেলেনি। চিনও এই বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে দাবি করেছে যে বর্তমান সীমান্ত পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।

উল্লেখ্য, বিগত কয়েক বছর ধরে অরুণাচল প্রদেশের একাধিক এলাকাকে নিজেদের দাবি করে লাগাতার বিভ্রান্তিকর মানচিত্র প্রকাশ করে আসছিল বেজিং। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ভারতের সমস্ত আপত্তি সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়ে এলএসি সংলগ্ন অরুণাচলের ৩০টি এলাকার নাম নিজেদের মতো করে বদলে দিয়েছিল চিন। সেই তালিকায় ছিল ১১টি বসতি এলাকা, ১২টি পাহাড়, ৪টি নদী, একটি হ্রদ, একটি গিরিপথ এবং একটি উপত্যকা। তারপরই অরুণাচল প্রদেশকে কেন্দ্র করে বেজিংয়ের ধারাবাহিক উস্কানি ও নামবদলের কৌশলের বিরুদ্ধে কড়া ও পাল্টা জবাব দিয়েছে নয়াদিল্লি। চলতি মাসেই প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা সংলগ্ন চিন-অধীকৃত তিব্বতের ২৭টি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার নামবদল করে ভারত তার কড়া অবস্থান স্পষ্ট করেছে। ভারতের জাতীয় মানচিত্র প্রস্তুতকারী সংস্থা ‘সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’ অরুণাচল প্রদেশের যে নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে, তাতেই এই নামগুলি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করা হয়েছে।