অবসরের পর ঘরে বসে না থেকে যা করলেন শিলিগুড়ির বৃদ্ধ, দেখলে চোখ কপালে উঠবে!

অবসর জীবন মানেই কি একাকীত্ব এবং সময় কাটানোর এক অন্তহীন লড়াই? সমাজের এই গতানুগতিক ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে এক নতুন ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন শিলিগুড়ির দেশবন্ধুপাড়ার বাসিন্দা তথা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী অনুপ দাস। কর্মজীবনের ব্যস্ত অধ্যায় শেষ করার পর তিনি নিজের বহুদিনের সুপ্ত শিল্পচর্চাকেই জীবনের নতুন পথসঙ্গী করে তুলেছেন। অ্যালুমিনিয়াম নেট এবং নানা ধরনের ধাতব পাত নিখুঁতভাবে ব্যবহার করে তিনি তৈরি করেছেন শিলিগুড়ির প্রথম ৫ ফুটের অ্যালুমিনিয়ামের গণেশ মূর্তি, যা ইতিমধ্যেই গোটা শহরজুড়ে চরম কৌতূহল ও ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
পেশাগত জীবনে অনুপবাবু পশ্চিমবঙ্গ মধ্য শিক্ষা পর্ষদের একজননিষ্ঠ সরকারি কর্মচারী ছিলেন। প্রায় দু’বছর আগে যখন তিনি অবসর নেন, তখন হঠাৎ করেই তাঁর জীবনের দীর্ঘদিনের ছন্দ ও রুটিন বদলে যায়। ঘরের নিত্যদিনের কাজের পরেও দিনের বাকি সময় যেন আর কাটতে চাইত না। ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে তিনি নিজের বহুদিনের সুপ্ত শিল্পীসত্তাকে পুনরায় জাগিয়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। সেই ভাবনা থেকেই অ্যালুমিনিয়াম নেট ও বিভিন্ন ধাতব উপকরণের অভিনব মিশ্রণে গড়ে তোলেন বিঘ্নহর্তা গণেশের এই ব্যতিক্রমী প্রতিমা। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শিলিগুড়িতে এই ধরনের শিল্পকর্ম এই প্রথমবার দেখতে পাওয়া গেল।
এর আগেও অনুপবাবু খবরের কাগজ দিয়ে অসাধারণ দুর্গা প্রতিমা তৈরি করে সকলের নজর কেড়েছিলেন এবং যথেষ্ট প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। এবার তিনি ধাতব শিল্পকে সম্পূর্ণ এক নতুন মাত্রা দিতে আরও বড় ও দূরদর্শী পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। তাঁর মূল লক্ষ্য হল, আধুনিক শিল্পভাবনা এবং ঐতিহ্যকে সুন্দরভাবে একসঙ্গে মিশিয়ে এমন কিছু প্রতিমা তৈরি করা, যা কেবল পুজোর মণ্ডপেই নয়, বরং নিখাদ শিল্পকর্ম হিসেবেও সাধারণ মানুষের মনে চিরস্থায়ী জায়গা করে নেবে। অনুপ দাস আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “অবসর মানেই জীবনের ইতি বা থেমে যাওয়া নয়। নিজের ভেতরের প্রতিভাকে যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে এই অবসর জীবনও অত্যন্ত সুন্দর ও আনন্দময়ভাবে কাটানো সম্ভব। আমি অ্যালুমিনিয়ামের গণেশ তৈরি করেছি, ভবিষ্যতে আরও নতুন এবং ব্যতিক্রমী কাজ করতে চাই। আমার সমবয়সী যাঁরা অবসর নিয়েছেন, তাঁদের সকলের কাছেও আমার বিনীত অনুরোধ, নিজের পছন্দের কোনো না কোনো সৃজনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকুন। এতে একাকীত্ব চিরতরে দূর হবে এবং মনও দারুণ ফুরফুরে থাকবে।” পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন পুজো কমিটি ও সামাজিক সংগঠনের কাছে তাঁর এই ব্যতিক্রমী শিল্পচর্চাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সার্বিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন।
অনুপবাবুর মতে, এই অভিনব উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য কেবল প্রতিমা তৈরি করে প্রদর্শনী করা নয়, বরং সমাজকে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও গঠনমূলক বার্তা পৌঁছে দেওয়া। তিনি আন্তরিকভাবে চান, বিভিন্ন ক্লাব ও সংগঠন তাঁর তৈরি এই অনন্য প্রতিমা বুকিং করার মাধ্যমে এই সৃজনশীল উদ্যোগকে আরও প্রসারিত করুক। অর্থের মোহের চেয়ে শিল্পের প্রকৃত স্বীকৃতি এবং মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসাকেই তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, সমাজের সর্বস্তরের মানুষ ও সংগঠনের সহযোগিতা পেলে এই ব্যতিক্রমী শিল্পচর্চাকে আগামী দিনে আরও অনেক বড় পরিসরে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
অবসরের পর নতুন স্বপ্ন দেখার এই জাদুকরি গল্প আজ বহু মানুষের কাছেই এক অপার অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে। জীবনের একঘেয়েমিকে সম্পূর্ণ হারিয়ে দিয়ে নিজের সৃজনশীল প্রতিভাকে নিখুঁতভাবে কাজে লাগিয়ে অনুপ দাস বিশ্ববাসীর সামনে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, প্রবল ইচ্ছাশক্তি এবং কিছু নতুন করে সৃষ্টির গভীর আনন্দ থাকলে জীবনের প্রতিটি নতুন অধ্যায়ই সমানভাবে উজ্জ্বল ও বর্ণময় হতে পারে। তাঁর এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ কেবল শিল্পের উৎকর্ষই নয়, বরং প্রতিটি মানুষের অবসর জীবনকে নতুনভাবে বাঁচার এক অনন্য ও পথপ্রদর্শক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।