অবসরের আর মাত্র এক বছর বাকি। জীবনের সেই পড়ন্ত বেলায় এসে হঠাৎই ছন্দপতন। প্রথমে জয়েন্টের সাধারণ ব্যথা মনে হলেও, পরে তা অসহ্য যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়াল ৫৯ বছর বয়সী প্রবাল রায়ের শরীরে। দীর্ঘ পরীক্ষার পর সামনে এল মাল্টিপল মাইলোমা নামক বোন ম্যারোর এক জটিল ক্যানসার। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের আশীর্বাদে ইমিউনোথেরাপি এবং অটোলগাস স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টের হাত ধরে বর্তমানে সম্পূর্ণ সুস্থ (রেমিশনে) এই সাহসী যোদ্ধা।
শুরুর লড়াই
বেসরকারি সংস্থার প্রাক্তন প্রোডাকশন ম্যানেজার প্রবাল রায়ের জীবন বদলে গিয়েছিল দু’বছর আগে। প্রথম দিকে হালকা ব্যথা থাকলেও দ্রুত তা এতটা বেড়ে যায় যে, সামান্য নড়াচড়াতেও তীব্র কষ্ট হতো। প্রথমে বেহালায় চিকিৎসা হলেও শারীরিক অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়লে তাঁকে নিউটাউনের একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। চিকিৎসক অরিজিৎ বিষ্ণুর তত্ত্বাবধানে শুরু হয় চূড়ান্ত লড়াই। প্রবালবাবু জানান, সেই সময়ে গাড়ির সামান্য ঝাঁকুনিও তিনি সহ্য করতে পারতেন না।
চিকিৎসার নতুন দিশা: ইমিউনোথেরাপি ও স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্ট
হেমাটোলজি বিশেষজ্ঞ ড. অরিজিৎ বিষ্ণু জানান, মাল্টিপল মাইলোমায় হাড়ের ভেতর থেকে ক্ষয় হতে শুরু করে এবং কিডনি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রবালবাবুর চিকিৎসায় চিরাচরিত কেমোর পরিবর্তে তিনি বেছে নেন আধুনিক ‘টার্গেটেড ইমিউনোথেরাপি’। এই পদ্ধতিতে ক্যানসার আক্রান্ত প্লাজমা কোষকে নির্দিষ্টভাবে নিশানা করা হয়, যাতে সুস্থ কোষের ক্ষতি ন্যূনতম হয়। এরপরই সম্পন্ন হয় অটোলগাস স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্ট। রোগীর নিজের স্টেম সেল সংরক্ষণ করে উচ্চমাত্রার কেমোর পর তা পুনরায় শরীরে প্রবেশ করানো হয়। দীর্ঘ ৩৬ দিনের কঠিন আইসোলেশন ও হাসপাতালের লড়াই শেষে আসে সাফল্যের মুখ।
নতুন সূর্যোদয়
চিকিৎসা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর নাগাদ প্রবালবাবুর শরীরে আর কোনো ক্যানসার মার্কার (এম-ব্যান্ড) পাওয়া যায়নি। ২০২৫ সালের মার্চ মাসেও রিপোর্ট একই থাকে, যা জানান দেয় তিনি এখন রেমিশনে রয়েছেন। প্রবালবাবু বলেন, “সময়টা আমার ও আমার স্ত্রীর জন্য কঠিন ছিল, কিন্তু চিকিৎসকদের আশ্বাস আমাদের নতুন করে বাঁচার শক্তি দিয়েছে।”
ড. রূপালি বসু জানান, ইমিউনোথেরাপি ও স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টের এই সমন্বয় মাল্টিপল মাইলোমা রোগীদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে। ক্যানসার জয়ের এই ঘটনা প্রমাণ করে, সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ এবং সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি কত বড় মারণ ব্যাধিকেও হার মানাতে পারে। তবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে চিকিৎসকরা তাঁকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।





