অফিস শেষ মানেই কি কাজ শেষ? ‘ডাবল শিফট’-এর চক্রে অজান্তেই কোন মারাত্মক বিপদ ডেকে আনছেন মহিলারা?

অফিসের আট ঘণ্টার কাজ শেষ হলেও অনেক কর্মজীবী মহিলার দৈনিক রুটিন বা ব্যস্ততা কিন্তু সেখানেই শেষ হয় না। সারা দিন দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটারের সামনে একটানা বসে কাজ করার পর বাড়ি ফিরে শুরু হয় দ্বিতীয় দফার যান্ত্রিক দৌড়—রান্না করা, ঘর পরিষ্কার রাখা, সন্তান বা পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের দেখাশোনা, বাজার করা কিংবা ভারী জিনিস তোলার মতো নানা গৃহস্থালির দায়িত্ব। ফলে শরীর, বিশেষ করে মেরুদণ্ড ও পিঠের পেশিগুলি পর্যাপ্ত বিশ্রামের বা পুনরুদ্ধারের সুযোগ পায় না। কর্মজীবনের সঙ্গে গৃহস্থালির এই অবিরাম দায়িত্ব পালনের অবস্থাকেই চিকিৎসকরা আজকাল ‘ডাবল শিফট’ বলে অভিহিত করছেন।
চিকিৎসকদের মতে, দিনের পর দিন এভাবে বিশ্রমহীন জীবন চলতে থাকলে পিঠ ও কোমরের পেশির ওপর অতিরিক্ত ও অস্বাভাবিক চাপ জমতে থাকে, যা ধীরে ধীরে ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার কারণ হয়ে উঠতে পারে। একটানা ডেস্কে বসে কাজ করা নিজেই পিঠের স্বাস্থ্যের জন্য বড় চাপ। বিশেষ করে ভুল ভঙ্গিতে বসা, দীর্ঘ সময় একই অবস্থানে অনড় থাকা কিংবা কাজের ফাঁকে সামান্য উঠে না নড়াচড়া করলে কোমর ও ঘাড়ের পেশিতে মারাত্মক টান তৈরি হয়। এরপর অফিসের গণ্ডি পেরিয়ে বাড়িতে ফিরে যদি আবার ঝুঁকে রান্না করা, মেঝে মোছা, ভারী কাপড় কাচা কিংবা সন্তানকে কোলে তোলার মতো কায়িক পরিশ্রমের কাজ করতে হয়, তবে সেই ক্লান্ত পেশিগুলি বিশ্রামের সুযোগ একেবারেই পায় না। অর্থাৎ, সারাদিনের পেশাগত মানসিক চাপ শেষ হওয়ার বদলে ঘরের মাঠে কাজের ধরন শুধু বদলে যায়। অফিসে যেখানে চাপটা মূলত দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা ও স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে তৈরি হয়, বাড়িতে সেখানে যুক্ত হয় অতিরিক্ত শারীরিক ও কায়িক পরিশ্রম।
কেন সমস্যা ধীরে ধীরে বাড়ে?
পিঠের তীব্র ব্যথা অনেক সময় রাতারাতি তৈরি হয় না। প্রতিদিন সামান্য করে অতিরিক্ত চাপ পড়তে পড়তে একটা সময় তা মারাত্মক আকার ধারণ করে। পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব থাকলে পিঠের পেশির ক্লান্তি, শক্ত হয়ে যাওয়া বা প্রদাহ আরও প্রকট হতে পারে।
কীভাবে পিঠের যত্ন নেবেন?
প্রথমেই বিশেষ নজর দিতে হবে বসার সঠিক ভঙ্গির দিকে। অফিসে এমন এর্গোনমিক চেয়ার ব্যবহার করা উচিত, যাতে কোমর ও পিঠ যথেষ্ট সাপোর্ট বা আধার পায়। দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে না থেকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর চেয়ার থেকে উঠে কয়েক মিনিট হাঁটাচলা করা বা হালকা স্ট্রেচিং করা অত্যন্ত উপকারী। বাড়ির কাজের ক্ষেত্রেও শরীরের সঠিক ভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনও ভারী জিনিস তোলার সময় হঠাৎ কোমর বাঁকিয়ে তা না তুলে যতটা সম্ভব সঠিক কৌশল ও পা বাঁকিয়ে তা তোলা উচিত।
‘বিশ্রাম’ বিলাসিতা নয়, জরুরি প্রয়োজন
অফিসের কাজ শেষ হওয়ার পর ঘরের সমস্ত দায়িত্ব একাই নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া এবং শরীরকে মোটেও বিশ্রাম না দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকে ভেঙে দিতে পারে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, পিঠের সুরক্ষার জন্য শুধু সঠিক চেয়ার বা সঠিক পোস্টারই যথেষ্ট নয়; শরীরকে পর্যাপ্ত রিকভারি টাইম বা পুনরুদ্ধারের সময় দেওয়াও সমানভাবে জরুরি। কাজের মাঝখানে ছোট বিরতি, পর্যাপ্ত গভীর ঘুম এবং প্রতিদিন কিছুটা সময় বের করে হালকা শরীরচর্চা বা স্ট্রেচিং—সবকিছুকেই দৈনন্দিন রুটিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে। কাজের চাপে সামান্য কোমর বা পিঠের ব্যথাকে অনেকেই সাধারণ ক্লান্তি ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু ব্যথা যদি বারবার ফিরে আসে এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করে, তবে দেরি না করে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি