ফুটবল নিয়তি বোধহয় একেই বলে! ২৫ বছর আগে, অর্থাৎ ২০০১ সালের মে মাসে ঠিক যে নাটকীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল ইস্টবেঙ্গল ক্লাব, ২০২৬ সালের এই মে মাসে এসেও হুবহু সেই একই সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে লাল-হলুদ ব্রিগেড। চলতি ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (ISL) বা ঘরোয়া মরশুমে চড়াই-উতরাইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে যখন সমর্থকরা আশঙ্কায় কাঁপছেন, তখন ইতিহাস মনে করিয়ে দিচ্ছে— ২৫ বছর আগেও লাল-হলুদ শিবির খাদের কিনারায় দাঁড়িয়েই ঘটিয়েছিল এক অবিশ্বাস্য রূপকথা। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল এবং মে মাসের সেই রুদ্ধশ্বাস দিনগুলিতে মরণ-বাঁচন লড়াই জিতে কীভাবে প্রথমবার ভারতের শ্রেষ্ঠ দল (National Football League – NFL) হয়েছিল ইস্টবেঙ্গল, আসুন ফিরে দেখা যাক সেই রোমাঞ্চকর ইতিহাস।
কোচ বদল আর খাদের কিনারা: হুবহু মিল ২৫ বছর পরেও!
চলতি ২০২৬ মরশুমে যেমন লিগের মাঝপথে কোচ বদলে অস্কার ব্রুজনের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে, ঠিক একইভাবে ২০০০-০১ মরশুমের মাঝপথে কোচ বদল করেছিল ইস্টবেঙ্গল। সৈয়দ নইমুদ্দিন সরে যাওয়ার পর লাল-হলুদ মশাল সামলানোর দায়িত্ব পেয়েছিলেন প্রবাদপ্রতিম মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য (মণি)।
আই-লিগের পূর্বসূরি তৎকালীন ‘জাতীয় ফুটবল লিগ’ (NFL)-এর খেতাবি লড়াইয়ে তখন ইস্টবেঙ্গলের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছিল চরম প্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগান এবং গোয়ার শক্তিশালী দল এফসি কোচিন। লিগের শেষ দুটি ম্যাচের ওপর নির্ভর করছিল ট্রফি কার ঘরে যাবে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল ছিল যে, একটি ভুলচুক হলেই ট্রফি হাতছাড়া হতো।
আইএম বিজয়ন ও বাইচুং ভুটিয়ার সেই ঐতিহাসিক যুগলবন্দি
২০০১ সালের সেই এপ্রিলে ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণভাগ ছিল এককথায় ভারতের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা। একদিকে ভারতীয় ফুটবলের ‘কালো চিতা’ আইএম বিজয়ন এবং অন্যদিকে ‘পাহাড়ি বিছে’ বাইচুং ভুটিয়া। মাঝমাঠে বল সাপ্লাই করছিলেন কার্লটন চ্যাপম্যান এবং ডিফেন্সে দেওয়াল তুলে দাঁড়িয়েছিলেন সুরেশ কুমাররা।
প্রাক্তন ফুটবলারদের স্মৃতিচারণায়, “শেষ ম্যাচে গোয়ার মাঠে গিয়ে এফসি কোচিনকে হারানো ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না লাল-হলুদের সামনে। গ্যালারিতে তখন হাজার হাজার গোয়ান সমর্থকের চিৎকার। কিন্তু মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের ছেলেরা সেদিন মাঠে নেমেছিলেন ট্রফি জেতার খিদে নিয়ে।”
কোচিনের মাঠে সেই রুদ্ধশ্বাস ফাইনাল!
৩০ এপ্রিল, ২০০১। কেরালার কান্নুরের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে কোচিনের মুখোমুখি হয় ইস্টবেঙ্গল। ম্যাচের প্রথমার্ধেই লাল-হলুদ সমর্থকদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে গোল করে এগিয়ে যায় কোচিন। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে খোলস ছেড়ে বেরোয় মণি-র ছেলেরা।
বাইচুং ম্যাজিক: ম্যাচের টার্নিং পয়েন্টে পেনাল্টি আদায় এবং দুর্দান্ত গোল করে সমতা ফেরান বাইচুং ভুটিয়া।
বিজয়নের হুঙ্কার: নিজের ঘরের মাঠে কোচিনের ডিফেন্স চুরমার করে জয়সূচক গোলটি তুলে নেন আইএম বিজয়ন।
রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে কোচিনকে ২-১ গোলে হারিয়ে লিগের ২২ ম্যাচে ৪৬ পয়েন্ট নিয়ে ভারতের ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবার জাতীয় লিগ (NFL) চ্যাম্পিয়ন হয়ে ইতিহাস লেখে ইস্টবেঙ্গল। রানার্স-আপ মোহনবাগানের পয়েন্ট ছিল ৪৫। মাত্র ১ পয়েন্টের ব্যবধানে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের টেক্কা দিয়ে খেতাব জিতেছিল লাল-হলুদ।
ইতিহাস কি পুনরাবৃত্তি ঘটাবে ২০২৬-এ?
আজ থেকে ঠিক ২৫ বছর আগের সেই মে মাসের ট্রফি জয়ের খতিয়ান লাল-হলুদ সমর্থকদের ধমনীতে নতুন করে রক্তসঞ্চার করছে। তৎকালীন অধিনায়ক চন্দন দাসের হাতে ওঠা সেই ট্রফিই বদলে দিয়েছিল ক্লাবের ভাগ্য। ২৫ বছর পর, ২০২৬ সালের মে মাসে এসে ইস্টবেঙ্গলের বর্তমান পরিস্থিতি যখন অনেকটাই একই রকম ডামাডোলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন সমর্থকরা প্রার্থনা করছেন— অস্কার ব্রুজনের দলও যেন মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের সেই ২০০১ সালের ‘স্পিরিট’ ফিরিয়ে এনে লাল-হলুদ মশালকে আবারও ভারতীয় ফুটবলের শীর্ষে নিয়ে যেতে পারে।





