মানবসভ্যতার জন্ম প্রকৃতির কোলে, কিন্তু সেই সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে গিয়েই আমরা ক্রমশ বিপন্ন করে তুলছি আমাদের আঁতুরঘরকে। এক শতাব্দী আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তপোবন প্রবন্ধে যে শঙ্কার কথা লিখেছিলেন, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে তা এক ভয়াবহ বাস্তব। আজ ৫ জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য—”Inspired by Nature. For Climate. For Our Future” এবং বার্তা— #NowForClimate। কিন্তু রাষ্ট্রপুঞ্জের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP)-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, বর্তমান পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে উদ্বেগজনক।
তিন সংকটের মুখে পৃথিবী
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, পৃথিবী বর্তমানে তিনটি প্রধান সংকটের মোকাবিলা করছে—জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের দ্রুত হ্রাস এবং দূষণ। UNEP-এর তথ্য অনুযায়ী, আমাদের জীবনযাত্রার চাহিদা মেটাতে আমরা ১.৬টি পৃথিবীর সমপরিমাণ সম্পদ ব্যবহার করছি। পৃথিবীর ৮০ লক্ষ উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতির মধ্যে প্রায় ১০ লক্ষ আজ বিলুপ্তির মুখে। মানুষের আগ্রাসনের ফলে পৃথিবীর ৭৫ শতাংশ ভূমি এবং ৬৬ শতাংশ সমুদ্র অঞ্চল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। সামুদ্রিক মাছের মজুদের ৯০ শতাংশই অতিরিক্ত আহরণের ফলে নিঃশেষিত।
যুদ্ধের আগুনে জ্বলছে পরিবেশ
পরিবেশের এই ধ্বংসলীলায় বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও যুদ্ধ। সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইরান এবং ইজরায়েল-আমেরিকার যুদ্ধের প্রথম ১৪ দিনেই প্রায় ৫০ লক্ষ টন গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়েছে। যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার পশ্চিম এশিয়াকে একটি ‘এনভায়রনমেন্টাল স্যাক্রিফাইস জোন’-এ পরিণত করেছে। জ্বালানি ডিপো ধ্বংসের ফলে যে বিষাক্ত কালো মেঘ ও বৃষ্টি তৈরি হয়েছে, তা পরিবেশের ভারসাম্যকে এক চরম বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
২০৫০ সালের পৃথিবী: এক বিভীষিকাময় ছবি
রাষ্ট্রপুঞ্জের গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট আউটলুক (GEO-7) রিপোর্টে ২০৫০ সালের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। যদি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর জন্য বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন না আনা হয়, তবে ২০৫০ সালের মধ্যে বার্ষিক নির্গমন ৭৫ বিলিয়ন টনে পৌঁছাবে, যা বর্তমানের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি। এর ফলে পৃথিবী আরও উষ্ণ, আরও দূষিত এবং বহু অঞ্চলে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, তীব্র তাপপ্রবাহ, খাদ্য সংকট এবং কোটি কোটি মানুষের জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কলকাতা ও ভারতের ভবিষ্যৎ
কলকাতার ভৌগলিক অবস্থান নিয়ে বিশিষ্ট পরিবেশবিদ সুভাষ দত্ত গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, প্রাকৃতিক সুরক্ষা কবচ থাকা সত্ত্বেও সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট আইন না মানায় ডাম্পিং গ্রাউন্ড থেকে মিথেন গ্যাস ছড়িয়ে পড়ছে। এটি কলকাতার জন্য আগামী দিনে বড় বিপর্যয় ডেকে আনছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস শুধু একদিনের উদযাপন নয়, প্রতিদিনের অভ্যাস হওয়া উচিত।
এখনও কি সময় আছে?
এখনও সময় ফুরিয়ে যায়নি। পৃথিবী আমাদের সংকেত পাঠাচ্ছে, এখন মানুষের উত্তর দেওয়ার পালা। বৃক্ষরোপণ, প্লাস্টিকের ব্যবহার বর্জন, প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণের মাধ্যমে এই ধ্বংসযাত্রা থামানো সম্ভব। ছোট ছোট পদক্ষেপই গড়ে তুলতে পারে বড় পরিবর্তনের ভিত্তি। পৃথিবী আমাদের সবার, একে রক্ষা করার দায়িত্বও আমাদেরই।





