ভারতের অর্থনৈতিক মানচিত্র এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির এক সংকটময় মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি বিশেষ আবেদন দেশজুড়ে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। পশ্চিম এশিয়ার অস্থির পরিস্থিতি এবং বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) আকাশছোঁয়া দামের মাঝে ভারতীয় রুপিকে রক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে আগামী এক বছর সোনা কেনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। মোদির এই ‘স্বর্ণ বর্জন’ তত্ত্বে যেমন একদিকে দেশপ্রেমের সুর রয়েছে, তেমনি অন্যদিকে রয়েছে এক গভীর অর্থনৈতিক সমীকরণ।
কেন সোনা কেনা বন্ধের আর্জি?
বর্তমানে ইজরায়েল-ইরান সংঘাতসহ পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। ভারত তার মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করে এবং এর মূল্য পরিশোধ করতে হয় মার্কিন ডলারে। প্রধানমন্ত্রীর মতে, ভারত যদি সোনা আমদানিতে ব্যয় হওয়া ডলার সাশ্রয় করতে পারে, তবে সেই অর্থ দিয়ে তেলের ক্রমবর্ধমান খরচ সামলানো সম্ভব হবে।
সোনা এবং ভারতীয় রুপির সম্পর্ক:
অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারতের সাধারণ মানুষের সোনা কেনার অভ্যাসের সাথে রুপির মানের সরাসরি ও গভীর সম্পর্ক রয়েছে:
১. ডলারের চাহিদা: ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সোনা আমদানিকারক। সোনা আনতে সরকারকে প্রচুর মার্কিন ডলার খরচ করতে হয়।
২. চলতি হিসাবের ঘাটতি (CAD): সোনা ও তেলের মতো বিলাসদ্রব্য ও জ্বালানি আমদানির পরিমাণ বাড়লে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারে ঘাটতি দেখা দেয়।
৩. রুপির অবমূল্যায়ন: যখন বাজারে ডলারের চাহিদা তুঙ্গে থাকে, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে রুপির মান পড়ে যায়। অর্থাৎ ১ ডলার কিনতে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে আগের চেয়ে অনেক বেশি টাকা বেরিয়ে যায়।
‘দেশসেবা’র নতুন সংজ্ঞা এবং মোদির পরামর্শ:
প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় পরিবারগুলিকে অনুরোধ করেছেন যেন তাঁরা বিয়ে বা বড় কোনো উৎসবের জন্য অন্তত এক বছর সোনা কেনা এড়িয়ে চলেন। তিনি বিষয়টিকে নিছক ব্যক্তিগত পছন্দ হিসেবে না দেখে ‘দেশসেবা’ হিসেবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। যদিও এককভাবে একটি পরিবারের সোনা কেনা বন্ধ করলে কোনো প্রভাব পড়বে না, কিন্তু ভারতের লক্ষ লক্ষ পরিবার যদি সম্মিলিতভাবে এই পথ অনুসরণ করে, তবে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
জ্বালানি বাঁচাতে আবারও ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’:
শুধু সোনা কেনাই নয়, জ্বালানি খরচ কমাতে প্রধানমন্ত্রী আবারও করোনা আমলের ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ সংস্কৃতির ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, “করোনার সময় আমরা যেভাবে অনলাইনে মিটিং বা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কাজ করেছি, সেই অভ্যাস আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। এতে পেট্রোল ও ডিজেলের ব্যবহার কমবে, যা পরোক্ষভাবে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার রক্ষা করতে সাহায্য করবে।” বিশ্বজুড়ে পেট্রোলিয়াম পণ্যের অগ্নিমূল্যের বাজারে ডলারের বহির্গমন রুখতে মোদির এই বহুমুখী কৌশল এখন ভারতের নতুন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।





