পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক এক নিরাপত্তা চুক্তি ঘিরে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। মাদক ও মানবপাচার প্রতিরোধের নামে হওয়া এই ১০ বছর মেয়াদি ‘সমঝোতা স্মারক’ (MoU) আসলে ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে গোয়েন্দা সহযোগিতার নতুন পথ প্রশস্ত করল কি না, তা নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন।
গত মাসে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন রাজা নকভির ঢাকা সফরের সময় এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, মাদক ও আন্তর্দেশীয় অপরাধ দমনে দুই দেশ তথ্য আদান-প্রদান এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা করবে। তবে ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো সীমান্ত নেই, ফলে সীমান্তে মাদক পাচার রোধের যুক্তিটি বেশ অস্পষ্ট। তাঁদের প্রশ্ন, যে দেশের সঙ্গে কোনো স্থলসীমান্ত নেই, তার সঙ্গে কিসের ভিত্তিতে এই গভীর নিরাপত্তা চুক্তি?
সবচেয়ে বিতর্কিত দিকটি হলো—চুক্তির আওতায় দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পারস্পরিক অনুরোধে ‘সমন্বিত অভিযান’ ও ‘কন্ট্রোলড ডেলিভারি অপারেশন’ চালাতে পারবে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এর আড়ালে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর মতো সংগঠনগুলো বাংলাদেশের ভূখণ্ডে সরাসরি তৎপরতার সুযোগ পেয়ে যেতে পারে। এটি ভারতের নিরাপত্তার জন্য একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পাকিস্তান-ঢাকা ঘনিষ্ঠতা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা স্পষ্ট। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় জিন্নাহর জন্মবার্ষিকী পালন থেকে শুরু করে শিক্ষা ও সরকারি আমলাদের প্রশিক্ষণে পাকিস্তানের ভূমিকা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন মহলে জল্পনা বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, টিটিপি (তেহরিক-এ-তালিবান পাকিস্তান)-এর জুজু দেখিয়ে এই নিরাপত্তা চুক্তির প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়েছে, যা অনেকের কাছেই অবাস্তব মনে হচ্ছে।
এই চুক্তি নিয়ে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি। সরকারি পর্যায়ে এটিকে কেবল একটি সাধারণ ‘সমঝোতা স্মারক’ হিসেবে দাবি করা হলেও, এর অন্তর্নিহিত প্রভাব নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও যথেষ্ট রহস্যজনক। দেশবাসী এবং ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের প্রশ্নের মুখে বাংলাদেশ সরকার এখন পর্যন্ত কোনো স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেয়নি।
ভারতের নিরাপত্তা মহলে প্রশ্ন উঠছে, পাকিস্তান এই চুক্তির মাধ্যমে কি ভারতের প্রতিবেশী দেশটিকে নিজেদের গোয়েন্দা বলয়ের অংশ করতে চাইছে? বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের সংবেদনশীল তথ্য পাকিস্তানের হাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের রাতের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে।
এই চুক্তির আসল রূপরেখা এবং ভবিষ্যতে এর প্রভাব কী হতে পারে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলে এখন ব্যাপক চর্চা চলছে।





