রাজনীতির আঙিনায় দুই বিপরীত মেরুর অবস্থান থাকলেও, ময়দানের সবুজ ঘাস যেন ক্রমশই রাজনৈতিক বৈরিতা ছাপিয়ে ‘মেলবন্ধনের’ নতুন আস্তানা হয়ে উঠছে। শুক্রবার আইএফএ সভাপতি তথা তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা কল্যাণ চৌবের আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠান কার্যত রাজনীতির অন্দরে নতুন আলোচনার জন্ম দিল। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি ক্রীড়া সংক্রান্ত সংবর্ধনা অনুষ্ঠান হলেও, মঞ্চের ছবিতে ফুটে উঠল এক বিরল দৃশ্য—যেখানে পাশাপাশি দেখা গেল বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতাদের।
এদিন কল্যাণ চৌবের ডাকা এই অনুষ্ঠানে বিজেপি নেতা-মন্ত্রীদের পাশাপাশি তৃণমূল শিবিরের হেভিওয়েটদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। একদিকে যখন মঞ্চের এক কোণে দেখা যাচ্ছে বিজেপি নেতা ও মন্ত্রী অশোক দিন্দা বা ক্ষুদিরাম টুডুকে, অন্যদিকে একই সারিতে বসে থাকতে দেখা গেল মন্ত্রী তাপস রায়, বিধায়ক মদন মিত্র এবং দেবাশিস কুমারকে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোকপাত হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাদা ও আইএফএ সভাপতি অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ও কল্যাণ চৌবের মতো ব্যক্তিত্বদের পাশে দাঁড়িয়ে অজিতবাবুর এই উপস্থিতি কি নতুন কোনো সমীকরণের ইঙ্গিত? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই ছবি নেহাতই সৌজন্যমূলক নয়, এর নেপথ্যে রয়েছে ময়দানকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো রাজনৈতিক বিন্যাস।
অনুষ্ঠানের আবহ ছিল বেশ ঘরোয়া। সিএবি সভাপতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় এবং কল্যাণ চৌবকে এক টেবিলে বসে খোশগল্পে মেতে উঠতে দেখা যায়। এই ছবিই প্রমাণ করে যে, মাঠের বাইরের রণকৌশল মাঠের ভিতরে প্রবেশ করতে চাইছে না। তবে উপস্থিত নেতাদের বক্তব্যে ছিল কৌশলী সুর। অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়কে যখন রাজনীতির সমীকরণ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়, তিনি কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলেন, “রাজনৈতিক লোক আসবে-যাবে। আমি তো এখানে নিয়মিত আসি। আমাকে এসব প্রশ্ন করা অবান্তর।” কল্যাণ চৌবের আমন্ত্রণে তাঁর সাড়া দেওয়াটা যে নিতান্তই ময়দানের স্বার্থে, তা তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
অন্যদিকে, তৃণমূলের অন্দরে যখন রাজনীতির নানা টানাপোড়েন চলছে, তখন ময়দানের এই মঞ্চে শাসকদলের মন্ত্রীদের উপস্থিতি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। মন্ত্রী তাপস রায় অবশ্য ময়দানকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখার পক্ষেই সওয়াল করেছেন। তাঁর সাফ দাবি, “ময়দানকে রাজনীতিমুক্ত করেই ছাড়ব।” এই বক্তব্য যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা বলাই বাহুল্য। কেননা অতীতে ময়দান বহুবার রাজনীতির ছায়ায় প্রভাবিত হয়েছে। সেই ছায়া থেকে ক্লাবগুলোকে বের করে আনার বার্তা কি এই মিলন উৎসবে দিলেন মন্ত্রী?
ময়দানের রাজনীতিতে এই নজিরবিহীন ছবি কি কোনো নতুন মেরুকরণের পূর্বাভাস? নাকি এটি কেবলই ফুটবলের স্বার্থে রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে এক হওয়ার প্রচেষ্টা? প্রশ্ন অনেক। তবে দিনের শেষে এই দৃশ্য এটাই স্পষ্ট করল যে, রাজনীতির বাইরের জগতেও এখন বড় কোনো পরিবর্তন আসার অপেক্ষায় রয়েছে ময়দান। এখন দেখার, এই সংবর্ধনা মঞ্চের আড়ালে কোন রাজনৈতিক অঙ্ক কষলেন নেতারা।





