বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে ফের একবার বড়সড় সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরল মার্কিন প্রশাসন। ইসলামিক স্টেট (ISIS)-এর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড তথা অন্যতম শীর্ষ কুখ্যাত জঙ্গি আবু-বিলাল আল-মিনুকি মার্কিন ও নাইজেরীয় যৌথ বাহিনীর এক ভয়ঙ্কর ও নিখুঁত সামরিক অভিযানে খতম হয়েছে। শনিবার খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে এই খবর জনসমক্ষে আনেন। ট্রাম্পের দাবি, এই হাই-প্রোফাইল আইএস কমান্ডারের মৃত্যুর ফলে বিশ্বজুড়ে জঙ্গি সংগঠনটির নেটওয়ার্ক ও নাশকতামূলক কার্যক্রম এক ধাক্কায় অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। নিজের স্বভাবসুলভ ও আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই অভিযানকে “অতি সতর্কভাবে পরিকল্পিত” এবং আফ্রিকার মাটিতে পরিচালিত “অত্যন্ত জটিল এক মিশন” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ২০১০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা আইএসআইএস এই মুহূর্তে সাংগঠনিকভাবে কিছুটা ব্যাকফুটে থাকলেও, তাদের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতার মৃত্যু নিয়ে এখনও পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি জারি করেনি।
মার্কিন গোয়েন্দা দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, নিহত আল-মিনুকি আইএসের আন্তর্জাতিক স্তরের সাংগঠনিক পরিকাঠামো এবং আর্থিক লেনদেনের মূল হোতা ছিল। আমেরিকার মূল ভূখণ্ড ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মার্কিন স্বার্থ এবং নাগরিকদের ওপর বড়সড় আত্মঘাতী হামলার নীলনকশা তৈরি করছিল এই জঙ্গি নেতা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ (Truth Social) একটি দীর্ঘ ও চাঞ্চল্যকর পোস্ট শেয়ার করে লিখেছেন, “আমার সরাসরি নির্দেশে, আমাদের সাহসী মার্কিন সেনা এবং নাইজেরিয়ার বীর সশস্ত্র বাহিনী যৌথভাবে বিশ্বের সবচেয়ে সক্রিয় ও বিপজ্জনক সন্ত্রাসীকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে চিরতরে নির্মূল করেছে। এই সূক্ষ্মভাবে পরিকল্পিত ও অত্যন্ত জটিল মিশনটি কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই সম্পূর্ণ ত্রুটিহীনভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে।”
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও প্রকাশ করেছেন যে, আফ্রিকার মাটিতে মোতায়েন মার্কিন সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের বিশেষ সূত্রগুলি দীর্ঘ সময় ধরে আল-মিনুকির গতিবিধির ওপর নজর রাখছিল এবং তারাই এই শীর্ষ জঙ্গির নিখুঁত অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য সরবরাহ করে। ট্রাম্প গর্জন করে বলেন, “সে আর আফ্রিকার নিরীহ মানুষকে সন্ত্রস্ত করতে পারবে না কিংবা আমেরিকানদের লক্ষ্য করে কোনো রক্তক্ষয়ী হামলার পরিকল্পনা করার সুযোগ পাবে না। তার অপসারণের পর আইসিসের বৈশ্বিক কার্যক্রম অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছে।” আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আবু-বিলাল আল-মিনুকির হত্যাকাণ্ড নিঃসন্দেহে আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সক্রিয় আইএস নেটওয়ার্কগুলির জন্য একটি মরণকামড়। তবে সংগঠনটি যেহেতু বর্তমানে একটি বিকেন্দ্রীভূত কাঠামো বজায় রেখে আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে কাজ করে, তাই তাদের সম্পূর্ণ নির্মূল করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
গ্লোবাল সিকিউরিটি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘কাউন্টার এক্সট্রিমিজম প্রোজেক্ট’-এর গোপন রিপোর্ট অনুযায়ী, আবু বকর মুহাম্মদ আল-মাইনুকি ওরফে আল-মিনুকি আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে সক্রিয় ইসলামিক স্টেট ইন ওয়েস্ট আফ্রিকা প্রভিন্স (ISWAP)-এর প্রধান জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ছিলেন। আইএসের বৈশ্বিক অর্থ জোগান ও গোপন স্লিপার সেল পরিচালনায় তার মারাত্মক ভূমিকার জন্য ২০২৩ সালের জুন মাসেই মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট তাকে ‘বিশেষভাবে মনোনীত আন্তর্জাতিক জঙ্গি’ (SDGT) হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিল। নাইজেরিয়ায় আইএস জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে এটিই প্রথম প্রাণঘাতী হামলা নয়। এর আগে তিনি অভিযোগ তুলেছিলেন যে নাইজেরিয়ায় উগ্রপন্থীদের দ্বারা খ্রিষ্টানদের ওপর চরম নির্যাতন চালানো হচ্ছিল, যদিও আফ্রিকার স্থানীয় সরকার তা অস্বীকার করে। কিন্তু ট্রাম্প তাঁর অবস্থানে অনড় থেকে উত্তর-পশ্চিম নাইজেরিয়ার একাধিক আইএস ক্যাম্পে শক্তিশালী বিমান হামলা চালানোর নির্দেশ দেন, কারণ তাঁর কাছে তথ্য ছিল যে এই সন্ত্রাসীরা নিরীহ খ্রিষ্টানদের নির্বিচারে হত্যা করছে। এছাড়াও, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের ৩০টিরও বেশি ঘাঁটিতে মনুষ্যবিহীন ড্রোন এবং যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল, যার ধারাবাহিকতা বজায় থাকল এই আফ্রিকান অভিযানেও।





