মহাভারতের যুদ্ধ কেবল রথ-গজ-অশ্বারোহী আর অস্ত্রের ঝনঝনানি ছিল না; এটি ছিল মূলত সম্পর্ক, দহন, অহংকার এবং ন্যায়ের এক জটিল লড়াই। এই মহাকাব্যের পাতায় পাতায় এমন সব যোদ্ধার নাম খোদাই করা আছে, যাঁদের বীরত্ব আজও আমাদের বিস্মিত করে। তবে সব লড়াইকে ছাপিয়ে আজও মানুষের মনে দাগ কাটে কর্ণ ও অর্জুনের দ্বৈরথ। কর্ণ ও অর্জুনের এই শত্রুতা কেবল সিংহাসনের জন্য ছিল না, এর পেছনে ছিল এক গভীর অপমান, তীব্র প্রতিহিংসা এবং লড়াইয়ের এক দীর্ঘ কাহিনী।
জন্ম থেকেই একাকীত্বের সংগ্রাম
কর্ণের জীবনের ট্র্যাজেডি শুরু হয়েছিল তাঁর জন্মের মুহূর্ত থেকেই। সূর্যদেব ও কুন্তীর আশীর্বাদে কর্ণের জন্ম হলেও, কুমারী অবস্থায় সন্তান লাভ করায় সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে কুন্তী নবজাতককে একটি ঝুড়িতে ভরে নদীতে ভাসিয়ে দেন। ভাগ্যক্রমে সারথি অধিরথ ও তাঁর পত্নী রাধা তাঁকে খুঁজে পান এবং নিজেদের সন্তানের মতো লালন-পালন করেন। এই কারণেই কর্ণ ‘সূতপুত্র’ হিসেবে পরিচিত হন। জন্মসূত্রে রাজপুত্র হওয়া সত্ত্বেও ভাগ্যের পরিহাসে তাঁকে সারথির পুত্র হিসেবে বড় হতে হয় এবং শৈশব থেকেই প্রতিটি পদে সামাজিক বৈষম্য ও অবহেলার শিকার হতে হয়। এই অবমূল্যায়ন কর্ণের মনে এক গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।
গুরু দ্রোণাচার্যের সভার সেই অভিশপ্ত অপমান
কর্ণ ও অর্জুনের শত্রুতার বিষবৃক্ষটি রোপিত হয়েছিল গুরু দ্রোণাচার্যের আয়োজিত যুদ্ধকলা প্রদর্শনীর দিন। সেই সভায় অর্জুন তাঁর অলৌকিক ধনুর্বিদ্যা প্রদর্শন করে যখন সকলের প্রশংসা কুড়াচ্ছিলেন, ঠিক তখনই কর্ণ সেখানে উপস্থিত হয়ে অর্জুনকে চ্যালেঞ্জ জানান। কর্ণ দাবি করেন, অর্জুন যা যা দেখিয়েছেন, তিনি তার চেয়েও উন্নত কৌশল দেখাতে পারেন। কিন্তু বীরত্বের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই কর্ণের জাতি ও বংশপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। তাঁকে ‘সূতপুত্র’ বলে বিদ্রুপ করে পাণ্ডবদের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, রাজপুত্র ছাড়া অন্য কেউ অর্জুনের সঙ্গে দ্বৈরথে নামার অধিকারী নন। বীর হওয়া সত্ত্বেও কুলে ছোট হওয়ার কারণে এই যে প্রকাশ্যে অপমান, তা কর্ণের হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছিল। অর্জুনের প্রতি কর্ণের ঘৃণা সেদিন থেকেই এক অলঙ্ঘনীয় প্রতিজ্ঞায় রূপ নেয়।
প্রতিশোধের আগুন ও অর্জুন বধের প্রতিজ্ঞা
কর্ণ বিশ্বাস করতেন, অর্জুনকে পরাজিত না করলে তাঁর নিজের যোগ্যতার প্রমাণ বিশ্ববাসী পাবে না। সেই অপমানের সভাতেই দুর্যোধন কর্ণকে ‘অঙ্গরাজ’ হিসেবে ঘোষণা করে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, যা কর্ণের আজীবন আনুগত্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু অর্জুনের প্রতি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল ক্ষমতার জন্য ছিল না, ছিল নিজের আত্মসম্মান পুনরুদ্ধারের লড়াই। এই প্রতিশোধস্পৃহাই তাঁকে অর্জুনকে হত্যার কঠোর প্রতিজ্ঞা নিতে বাধ্য করেছিল। মহাভারতের পাতায় কর্ণ তাই কেবল এক যোদ্ধা নন, বরং এক সামাজিক সংগ্রামের প্রতীক হয়েই রয়ে গিয়েছেন।





