“বেকসুর খালাস পেলেন অভিযুক্তরা”-১৭ বছর পর প্রশ্ন, মালেগাঁও বিস্ফোরণ কান্ড ঘটালো কে?

২০০৮ সালের চাঞ্চল্যকর মালেগাঁও বিস্ফোরণ মামলার দীর্ঘ ১৭ বছরের বিচার প্রক্রিয়া শেষে গতকাল, বৃহস্পতিবার, মুম্বইয়ের বিশেষ এনআইএ আদালত মামলার সাত অভিযুক্তকেই ‘যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে’ বেকসুর খালাস ঘোষণা করেছে। এই রায়ের ফলে নিহত ৬ জন এবং আহত শতাধিক মানুষের ক্ষতির পিছনে আসল দায়ী কারা, সেই প্রশ্ন নতুন করে সামনে চলে এসেছে। খালাসপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন বিজেপি নেত্রী ও প্রাক্তন সাংসদ প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর এবং সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের তৎকালীন অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল প্রসাদ শ্রীকান্ত পুরোহিত।

আদালতের রায় এবং প্রমাণের অভাব:

এনআইএ বিশেষ আদালতের বিচারক এ কে লাহোটি রায় ঘোষণা করতে গিয়ে স্পষ্ট জানান যে, প্রসিকিউশন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অকাট্য ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পেশ করতে এবং যুক্তিসঙ্গত সংশয়ের ঊর্ধ্বে তাদের অপরাধ প্রমাণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, “সন্ত্রাসবাদের কোনো ধর্ম হয় না, কারণ কোনো ধর্মই সন্ত্রাসবাদকে মদত দেয় না।” বিচারক আরও উল্লেখ করেন, “সমাজের বিরুদ্ধে গুরুতর একটি ঘটনা ঘটেছে। তবে আদালত কাউকে কেবল নৈতিক ভিত্তিতে শাস্তি দিতে পারে না।” আদালত জানিয়েছে, তদন্তকারী সংস্থা বিস্ফোরণ প্রমাণ করতে পারলেও, মোটরসাইকেলে বোমা ফিট করার বিষয়টি কিংবা বিস্ফোরণের পিছনে কোনো ষড়যন্ত্র বা মিটিং হওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করতে পারেনি। এমনকি, কর্নেল পুরোহিত কাশ্মীর থেকে আরডিএক্স এনেছিলেন বা তাঁর বাড়িতে বোমা তৈরি হয়েছিল, কিংবা বিস্ফোরণে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি সাধ্বী প্রজ্ঞা ঠাকুরের ছিল—এমন কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণও মেলেনি।

আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেছে যে, বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন (UAPA) এই মামলায় প্রযোজ্য হতে পারে না, কারণ UAPA যুক্ত করার জন্য স্যাংশন অর্ডার ত্রুটিপূর্ণ ছিল এবং ফোনকলে আড়িপাতার ক্ষেত্রেও উপযুক্ত জায়গা থেকে অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

‘হিন্দু সন্ত্রাসবাদ’ বিতর্ক:

২০০৮ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর রমজান মাসে মহারাষ্ট্রের নাসিক জেলার মালেগাঁওয়ের ভিকু চকে ওই বিস্ফোরণ ঘটেছিল। নিহতদের সবাই মুসলিম সম্প্রদায়ের হওয়ায় ঘটনার পর একটি হিন্দু সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে এবং ‘হিন্দু সন্ত্রাসবাদ’ শব্দবন্ধটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। এই রায়ের পর মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা দেবেন্দ্র ফড়নবীশ মন্তব্য করেছেন যে, “হিন্দু সন্ত্রাসবাদ বলে যে কিছু হয় না, ফের তা প্রমাণিত হলো।” এর একদিন আগেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদে একই মন্তব্য করেছিলেন।

ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতিক্রিয়া ও এনআইএ-র অবস্থান:

আদালত এই রায়ে বিস্ফোরণে নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে। নিহতদের পরিবারের অনেকেই এই রায়ে অসন্তুষ্ট এবং ‘সুবিচার’ পেতে প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

এদিকে, জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার (এনআইএ) এক অফিসার জানিয়েছেন, তারা এখনও রায়ের কপি পাননি। রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর তা খতিয়ে দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা হবে বলে তিনি জানান। এর আগে এ বছর এপ্রিল মাসে এনআইএ অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের আবেদন জানিয়েছিল।

অভিযুক্তদের প্রতিক্রিয়া:

মামলা থেকে খালাস পাওয়ার পর ভোপালের প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর বলেন, “এটা ভাগ্যের জয়, হিন্দুত্বের জয়। যারা দোষ করেছে, ঈশ্বর তাদের শাস্তি দেবেন।” লেফটেন্যান্ট কর্নেল প্রসাদ শ্রীকান্ত পুরোহিত বিচার ব্যবস্থার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “সবটা ঠিকঠাক অনুধাবন করে আমাদের সবাইকে সুবিচার দিল বিচার ব্যবস্থা। কঠিন সময়ে আমার লড়াইয়ে আমি সেনাবাহিনীকে আমার পাশে পেয়েছি।”

এই মামলায় খালাস পাওয়া অন্য অভিযুক্তরা হলেন মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) রমেশ উপাধ্যায়, অজয় রাহিরকর, সমীর কুলকার্নি, সুধাকর চতুর্বেদী এবং সুধাকর দ্বিবেদী ওরফে শঙ্করাচার্য। তাদের বিরুদ্ধে আনা খুন, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র সহ UAPA-এর একাধিক ধারার অভিযোগ থেকে তাদের মুক্ত করা হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে মহারাষ্ট্র পুলিশের এটিএস এই মামলার তদন্ত শুরু করেছিল। ২০১১ সালের এপ্রিলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশে তদন্তভার এনআইএ-র কাছে যায়। বিচার চলাকালীন ৩২৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ৪০ জন সাক্ষী বিরূপ হয়ে যান। বিরূপ হওয়া সাক্ষীদের একাংশ আবার দাবি করেন যে, মহারাষ্ট্র পুলিশের এটিএস তাদের ভয় দেখিয়ে বয়ান দিতে বাধ্য করেছে। এই রায়ের পর মালেগাঁও বিস্ফোরণের প্রকৃত দোষীদের পরিচয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy