তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার প্রায় তিন দশক পর কি সত্যিই অন্তিম লগ্নে এসে পৌঁছেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল? বিধানসভার পর এবার লোকসভাতেও কি বড়সড় ভাঙন অনিবার্য? সম্প্রতি রাজ্যসভার সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়ের বিস্ফোরক মন্তব্য এবং কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধোঁয়াশাপূর্ণ প্রতিক্রিয়ায় সেই জল্পনাই এখন রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
২৮ বছর আগে যে দলের উত্থান হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে, সেই দলের রাশ এখন আর তাঁর হাতে নেই বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিধানসভায় বিদ্রোহী বিধায়কদের একাংশ নেত্রীর সিদ্ধান্ত অমান্য করে নিজেদের পছন্দমতো বিরোধী দলনেতা, উপ-বিরোধী দলনেতা ও মুখ্য সচেতক বেছে নেওয়ায় স্পষ্ট হয়েছে যে দলের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়েছে। সেই বিদ্রোহের আঁচ এবার পৌঁছাতে শুরু করেছে সংসদীয় রাজনীতিতেও।
রাজ্যসভার সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায় সরাসরি দাবি করেছেন, “বিধানসভায় এত দ্রুত ৬০ জন বিধায়ক দলবদল করবেন, তা ভাবাই যায়নি। লোকসভাতেও ঠিক একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে।” এখানেই থেমে না থেকে তিনি আরও যোগ করেন, “লোকসভার বেশ কয়েকজন সাংসদ ইতিমধ্যেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং তাঁরা পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।” বর্তমানে লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে তৃণমূলের মোট ৪২ জন সাংসদ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে যদি একটা বড় অংশ সত্যিই বিদ্রোহের পথে হাঁটেন, তবে জাতীয় রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের অস্তিত্ব রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
তৃণমূলের অন্দরের এই ডামাডোলের মাঝে সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও দলের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ধোঁয়াশা বজায় রেখে বলেছেন, “এখন কোনো কিছুই বুঝতে পারছি না। সব অঙ্ক গুলিয়ে গেছে। যতক্ষণ চূড়ান্ত কোনো ঘটনা না ঘটছে, ততক্ষণ কিছু বলা সম্ভব নয়।” এই মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে জল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে যে, দলের ভেতরে বড় কোনো পরিবর্তন হতে চলেছে।
এদিকে, ১৫ই জুন প্রাথমিকে নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ইডি ফের তলব করেছে তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সিবিআই-এর তৃতীয় অতিরিক্ত চার্জশিটে সুজয়কৃষ্ণ ভদ্র ও শান্তনুর কথোপকথনের ট্রান্সক্রিপ্টে ‘অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়’ নামের উল্লেখ থাকায় অস্বস্তি বেড়েছে শাসকদলের। নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগ, একের পর এক নেতার গ্রেফতারি এবং এখন সাংসদদের বিদ্রোহের ইঙ্গিত—সব মিলিয়ে ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত দলটির ভিত্তি আজ চরম সংকটের মুখে। মমতার কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়ে তৃণমূলের অন্দরের এই ফাটল যেদিকে মোড় নিচ্ছে, তাতে আগামী কয়েক দিন বাংলার রাজনীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের পূর্বাভাস পাচ্ছেন অভিজ্ঞ মহল।





