বাংলার শাসকদলের অন্দরে ফাটল চওড়া হয়ে এক চরম রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিস্ফোরক দাবি, দলের অন্দরে বর্তমানে এক বিদ্রোহের আগুন জ্বলছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬০ জনই দল ভেঙে বিধানসভায় একটি পৃথক গোষ্ঠী তৈরি করতে প্রস্তুত। আপাতদৃষ্টিতে এই ৬০ সংখ্যাটি তৃণমূলের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হলেও, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে সবচেয়ে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সংখ্যালঘু বিধায়কদের অবস্থান। এই ৬০ জন বিদ্রোহী বিধায়কের মধ্যে অন্তত ১৭ থেকে ১৮ জন মুসলিম বিধায়ক রয়েছেন, যাঁরা মুর্শিদাবাদ, মালদহ এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো সংখ্যালঘু-প্রধান এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ১৭ সংখ্যাটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকের অপ্রতিদ্বন্দ্বী দুর্গে বড়সড় ফাটলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সংখ্যালঘু বলয়ের এই বিধায়কদের বিদ্রোহের কারণ কেবল দলীয় ক্ষোভ নয়, বরং নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইও। তৃণমূল নেত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত জাভেদ আহমেদ খানের মতো হেভিওয়েট বিধায়কও এই সমান্তরাল শিবিরের পাশে দাঁড়ানোয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অস্বস্তি কয়েক গুণ বেড়েছে। এদিকে, এই সুযোগে নিজেদের হারানো জমি উদ্ধারে মরিয়া কংগ্রেস শিবির। প্রদেশ কংগ্রেসের সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, বিদ্রোহী মুসলিম বিধায়করা ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় ও প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ শুরু করেছেন। প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরীর দাবি, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এই বিধায়করা তৃণমূলে থাকলে নিজেদের এলাকায় মুখ দেখাতে পারবেন না, তাই তাঁরা বিকল্পের সন্ধানে নেমেছেন।
অন্যদিকে, বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, তাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এখনও নেত্রী হিসেবে মানেন, কিন্তু পরিষদীয় দলের বর্তমান কার্যপদ্ধতি ও নেতৃত্বের ধরনে তাঁরা বিরক্ত। বিধায়ক আখরুজ্জামান খানের বক্তব্য, তাঁরা দলের মর্যাদা রক্ষার্থে এই অবস্থান নিচ্ছেন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁদের ‘প্রধান উপদেষ্টা’ হিসেবে পেতে চাইছেন। কিন্তু এই আবেদন আদতে নেত্রীর ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল কি না, তা নিয়ে সন্দিহান রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তৃণমূলের গত এক দশকের সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকের ওপর একাধিপত্য ধরে রাখার মূল চাবিকাঠি ছিল স্থানীয় নেতা এবং ধর্মীয় গুরুদের বিশাল নেটওয়ার্ক। সেই নেটওয়ার্কেই এখন ভাঙন ধরেছে। বিধায়কদের একাংশ পর্দার আড়ালে আইএসএফ-এর (ISF) সঙ্গেও যোগাযোগ শুরু করেছেন বলে খবর। দলনেত্রীর জন্য এই বিদ্রোহ কেবল বিধায়ক হারানোর ভয় নয়, বরং সংখ্যালঘু মানুষের কাছে এই বার্তা যাওয়া যে তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্য শেষ হতে চলেছে। এই রাজনৈতিক দোলাচল আগামী দিনের বঙ্গ রাজনীতিতে বড় কোনো রদবদলের পূর্বাভাস কি না, সেটাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।





