জলপাইগুড়ির গয়েরকাটা গার্লস হাইস্কুল চত্বরে বৃহস্পতিবার যা ঘটল, তা রীতিমতো অস্বস্তিতে ফেলেছে স্থানীয় প্রশাসনকে। স্কুলের সরকারি নথিপত্র এবং ফাইল নিয়ে প্রাক্তন তৃণমূল নেতা তথা বিদ্যালয়ের প্রাক্তন পরিচালন সমিতির সভাপতি মানস রঞ্জন ঠাকুরের বাড়িতে যাওয়ার পথে স্থানীয় বিজেপি নেতাদের হাতে কার্যত হাতেনাতে ধরা পড়লেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা কণিকা রায়। ফাইল ভর্তি সরকারি কাগজপত্র কেন এক রাজনৈতিক নেতার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তা নিয়েই এখন তুঙ্গে উঠেছে রাজনৈতিক তরজা।
ঘটনার সূত্রপাত বৃহস্পতিবার সকালে। কণিকা রায় যখন ফাইল হাতে নিয়ে স্কুল থেকে বেরোচ্ছিলেন, তখনই বিজেপি নেতারা তাঁকে ঘিরে ধরেন। ফাইল চেক করতেই বেরিয়ে আসে স্কুলের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিপত্র। বিজেপি নেতা কৌশিক নন্দীর অভিযোগ, সরকারি স্কুলের ফাইল কোনোভাবেই ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারে না এবং তা কোনো রাজনৈতিক নেতার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার আইনত কোনো অনুমতি নেই। কৌশিকবাবু সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, “প্রাক্তন সভাপতি হলে তিনি স্কুলেই আসুন। সই বা সিলের প্রয়োজনে সরকারি ফাইল নেতার বাড়িতে পাঠানোর এই অদ্ভুত নিয়ম কোথায় লেখা আছে?”
ধরা পড়ার পর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকার বয়ানে ক্রমাগত অসামঞ্জস্য ধরা পড়ে। শুরুতে কণিকা রায়ের দাবি ছিল, “ওগুলো আমার ব্যক্তিগত ফাইল। আমি প্রাক্তন সভাপতির বাড়িতে কিছু সইয়ের কাজে গিয়েছিলাম।” কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরেই তিনি সুর বদলে দাবি করেন, “সই করা হয়নি, কারণ আমি সিল আনতে ভুলে গিয়েছিলাম।” সই করাতে গিয়ে সিল ভুলে যাওয়ার অজুহাতে ফাইল নিয়ে নেতার বাড়িতে যাওয়ার এই যুক্তি স্থানীয় মানুষজন এবং অভিভাবকদের কাছে একেবারেই গ্রহণযোগ্য হয়নি। এই দ্রুত বয়ান বদল থেকেই স্থানীয় বিরোধীদের সন্দেহ, স্কুলের কোনো পুরনো অনিয়ম ঢাকতেই তড়িঘড়ি এই ফাইল সরানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল।
এই ঘটনা জানাজানি হতেই এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়ায় এবং খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছায়। অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষিকাকে এ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে পুলিশ। যদিও প্রাক্তন পরিচালন সমিতির সভাপতি মানস রঞ্জন ঠাকুরকে বারবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি, ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
স্কুলের ফাইল নেতার বাড়ি যাওয়ার ঘটনায় স্থানীয় মহলে প্রশ্ন উঠছে— তাহলে কি স্কুলটি আদতে দলীয় কার্যালয়ের মতো চলছে? নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি নথিপত্র স্কুলের বাইরে নিয়ে যাওয়ার কোনো অবকাশ নেই। যদি সত্যিই সই-সিলের প্রয়োজনীয়তা থাকত, তবে তা স্কুলের ভেতরেই হওয়ার কথা ছিল। নেতার বাড়িতে কেন ফাইল নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তা নিয়ে এখন তদন্তের দাবি তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন নাগরিকরা। সরকারি নথি ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, তাই এই অনিয়মের দায়ভার কণিকা রায়কে নিতেই হবে—এই দাবিই এখন জোরদার হচ্ছে গয়েরকাটা এলাকায়। ঘটনাটি বর্তমানে জেলার শিক্ষা মহলে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে।





